না না আমার অফিসে
না না আমার অফিসে
বাবার অফিসে, না না আমার অফিসে বসে
কফির কাপে চুমুক দিচ্ছি। এইতো বছর খানেক
আগে পড়াশুনা শেষ হল।ছোটবেলা থেকেই
দায়িত্ব বোধের কোনো বালাই আমার ছিল


না ,তাই নিয়মিত অফিসেও আসতাম না।মাস
খানেক হবে আব্বু জোর করেই দায়িত্ব চাপিয়ে
দিয়েছেন। তাও দিনে একবার এসে বকাবকি
করে যান।এসব ভাবতে ভাবতেই দরজায় নক। স্যার!
আসতে পারি? নিশ্চয়ই কেও আমার অটোগ্রাফ
নিতে এসেছে।আচ্ছা দিয়েই দেই।
-আসুন বলেই কফি সরিয়ে রাখলাম।
-স্যার,আপনি তো জানেন আজ অফিসে নতুন
স্টাফ নেওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার চলছে। তবে
একটি মেয়ে,নিজের চাকরির আবেদনে
আসেননি।তিনি বলছেন,তার এক বন্ধু
অসুস্থ,তিনি তার হয়ে চাকরির আবেদন করতে
এসেছেন। আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।
আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি ,তিনি
যেভাবে আকুতি করছিলেন,তাই আপনাকে
জানালাম।
-না বিরক্ত হইনি। তিনি কোথায়?
-বাহিরে অপেক্ষা করছেন।
(সি সি টিভির স্ক্রিন দিয়ে
দেখলাম,মেয়েটা আমার অনেক কাছের একজন।
কিছুদিন আগেও আমার হৃদয় জুড়ে বাস করত।)আচ্ছা
তাকে বসতে বলেন,আমি ডেকে নেব।
হঠাৎ করেই মনটা মোচর দিয়ে উঠল।তাকে
হারানোর যে বেদনাটা বেস্ততার চাদরে
ঢেকে রেখেছিলাম,তা বুকচিরে বেরিয়ে
আসতে চাইছে। ২ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে
নিজেকে স্বাভাবিক করার উদ্দেশে সময়
নিলাম।
এই মেয়টি ,আমার জীবনের প্রথম ও শেষ
ভালবাসা।তার সাথে আমার পরিচয় ৫ বছর এর
মত।এক ঝুম বৃষ্টির রাতে, ভিজে ভিজে বেস্ত
শহরের নিরব এক পথের ধার দিয়ে হাতছিলাম।
পথের এক পাশে মেয়েটি বসে কাঁদছিল, খুব
কাঁদছিল।রাত বাজে ১১ টার বেশী। এতো
রাতে একটি মেয়ে এভাবে কাঁদতে দেখে
মায়া হচ্ছিলো, আবার ভয়েও লাগছিল, কাছে
গেলে দলবল নিয়ে ধরে মার না দেয়! আমি তখন
কলেজে পড়ি প্রথম বর্ষে ।তাকেও দেখে
সমবয়সী লাগল। খানিক্ষন ভেবে, সাহস নিয়েই
কাছে গেলাম।
এই যে আপনি কাঁদছেন কেন? আচ্ছা কাঁদছেন
ভালো কথা,তবে এতো রাতে নিরিবিরি
রাস্তায় বসে কাঁদলে, চার পায়ের কুকুর গুলো
বাদেও মানুষ রুপী কিছু কুকুর এর নজরে পরবেন।
আপনি বরং বাসায় গিয়েই কাঁদুন।কি হলো কিছু
বলছেন না যে?
– যাবো না আমি বাসায়।বাসা থেকে
পালিয়ে এসেছি,কিভাবে যাব! বলেই আবার
কাঁদতে আরম্ভ করল।
অহ!! বুঝেছি বুঝেছি, তো যেই রমিও এর জন্য
বেরিয়ে এলেন,তিনি নিশ্চয়ই আসেন নি?
– না সে এসেছিল,এসে আমার বিশ্বাস ভেঙ্গে
চলে গেছে, আমায় নাকি সে বাসায় নিতে
পারবে না।লাগবে না আমার কারো আশ্রয়,
আমি এখানেই থাকব।আপনি আপনার পথ ধরুন।
আমায় বিরক্ত করবেন না।
– আরেহ ভাববেন না যে, আমি আশ্রয় দিতে
এসেছি। এতো রাতে,অন্ধকারে একটি সুন্দরী
মেয়ে বসে বসে কাদছে,তাই বুঝেনেই তো
আকর্ষণের জরে চলে এলাম।জানেন তো,
রাতের আধারে,আপনার মতো সুন্দর মেয়ে কে
দেখলে,কিছু লোকের নজর তো কাড়বেই, ছোট
বাচ্চাদেরই নিরামত্তা নেই আর আপনি তো
কলেজ বা ভার্সিটি তে পড়েন,তার ওপর বৃষ্টি
টে পুরো ভিজে গেছেন। দুঃখিত আপনার
কান্নার সময়ে বিরক্ত করলাম, শুভ রাত্রি।বলেই
আমার পথে হাঁটতে শুরু করলাম। নিশ্চয়ই
মেয়েটিও আসবে।
– ২ পা এগোতেই মেয়েটি ডাক দিল।এইযে
শুনুন,আপনি কেমন মানুষ বলুনতো! এতো রাতে
একটি অসহায় মেয়ে কে ফেলে চলে যাচ্ছেন!
দাঁড়ান, আমিও আসছি।
–একদম না! আপনি আপনার মতো কাঁদেন, আমার
সাথে কথায় যাবেন?
– আমার ব্যবহার এর জন্য দুঃখিত, কিছুদূরেই আমার
বাসা,দয়া করে একটু সাহায্য করবেন?
-এতো সুন্দর একটি মেয়ের সাথে পাশাপাশি
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে যাব!! এ সুযোগ কারকবে
হয়েছে! সেদিন থেকেই, সেই রাতে শুরু হল
জীবনের নতুন গল্প।বুন্ধুত্ত,
তারপর সম্পর্কে এর পরিণতি।দুজন দুজনকে
ভালোবেসে দিনকাল বেশ ভালোই চলছিল।
জীবনের অনেক গুলো বাঁক হাতে হাত রেখে
পেরুতে পেরুতে ৪ বছর হতে চলেছে!
দু’মাস আগের কথা, দিনটি আমাদের জীবনের
বিশেষ দিন।আমাদের সম্পর্কের ৪ বছরের পূর্তি ।
প্রতিবারের মতো তার পছন্দের অনেক গুলো ফুল
নিয়ে সামনে হাজির হলাম। এবার সাথে
একটি আংটিও আছে, সারাজীবন এর জন্য তার
হাতটি চেয়ে নেব বলে। তবে, আজ তার ঠোঁটে
কোনো হাসি নেই।নিজেই বলল আজকে একটি
জিনিস চাইব, তোমাকে দিতেই হবে।
– কি চাই তোমার?
-আগেও অনেক বার বলেছি,আজ আবারও বলছি,
এবার একটা চাকরি নিয়ে নাও না।
-হুম, চাকরি তো করবো। চাকরি নিয়েই তোমার
বাবার আছে তোমার হাত চাইতে যাবো। আজ
নাহয় থাকুক সে কথা।
– তুমি বুঝতে চাইছ না কেন? বাসায় বিয়ের কথা
বলছে। তোমার মতো বেকার ছেলের সাথে
কে বিয়ে দিবে?
– আরেহ বাবা,রাগ করছ কেন? শান্ত হও।
প্রতিদিন চাকরি চকারি কর কেন? বিয়ের তো
অনেক দেরি,আমার বিরক্ত লাগে।
-হুম।বিরক্ত তো লাগবেই।আর কত দেরি? অহ! এবার
বুঝেছি,তুমি মুক্তি চাইছ তো?আমকে আর ভালো
লাগে না,তাই চাইছ যাতে আমার বিয়ে হয়ে
যাক। বললেই হত যে তুমি মুক্তি চাও, আমকে
ব্যবহার করা শেষ , যত তাড়াতাড়ি বিদায় হব
ততই তোমার জন্য ভালো। নতুন মেয়ের পেছনে
ছুটবে।
-কথা গুলো হজম করতে পারলাম না।মেজাজটা
বিগ্রে গেল,আমিও বলে উঠলাম, হুম।মুক্তি
চাইছি।অনেক অভিনয় হয়েছে আর পারছি
না,আমায় মুক্তি দাও!!
– তবে তাই হউক।ভাল থেক, কখনো যোগাযোগ
করতে আসবে না।
এসব বলেই সে চলে্ যাচ্চিল,হয়তো চোখের কণে
জল ছিল,আরাল করে রেখেছিল।আর আমিও
তাকে না থামিয়ে পাশে পরে থাকা অসহায়
ইট এর টুকরোগুলোকে লাথি মারতে মারতে,
ঝাপসা চোখে তার চলে যাওয়া দেখেছি।
ঝগড়া তো আগেও হয়েছে,তবে সেদিন এর পড় র
যোগাযোগ করতে পারিনি,
চেয়েছিলাম,পারিনি।অভিমানে করি নি।
মান-অভিমান এর এই লড়াইয়ে, আংটি টা আমার
বেদনার সৃতি হয়ে পকেটেই রয়ে গেল।
আহা! প্রায় ১০ মিনিট ধরে মেয়েটি বাহিরে
বসে আছে।তাকে ডেকে পাঠালাম ।এতো দিন
পর আজ এভাবে দেখা হবে! সে রুমে ঢোকার
আগেই আমি মুখলুকাতে চেয়ার ঘুরিয়ে বসে
পরলাম।
– আসসালামু আলাইকুম স্যার। আসতে পারি?
-সালামের জবাব না দিয়েই একটু ভারী গলায়
বললাম, আসো।
-ধন্যবাদ বলে সে চেয়ার টেনে বসে পরল।
-তোমার কথা আমাকে বলেছে। তো যার সি
ভি এনেছ সে কি সুধুই বন্ধু নাকি বেশি কিছু?
-এমন প্রশ্নে কিছুটা ইতস্ত বোধ করছে নীরা
,জি.. মানে আমর ফিয়ান্সে .. আমার পুরো
পৃথিবী নিমিশেই উলটে গেল। ফিয়ান্সে!? ২
মাস এর মাথাই সে বিয়ে করতে চলেছে!আমার
সাথে একটি বার যোগাযোগ করতে চাইনি!
এতোকাল ধরে জাকে নিয়ে সপ্নের জাল
বুনছিলাম,যার সাথে কথা না হলে দিনটাই
খারাপ যেত, আমারকিছু হলে যেই মেয়েটা
ভয়ে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদত, সে বিয়ে
করছে! নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম
না.২ হাতে জোরে জোরে তালিবাজাতে
বাজাতে ঘুরে তার দিকে মুখ করে বসলাম।
-বিস্ফোরিত চোখে নীরা তাকিয়ে আছে।শু..
শুভ তুমি এখানে?এই কম্পানির…
-তো মিস নীরা। কেমন আছেন?নিশ্চয়ই অনেক
ভালো। ভালো থাকার জন্যে তো ছেড়ে
গিয়েছিলেন। আবার আমার কাছে চাকরির
আবেদন করতে কেমন লাগছে? নিশ্চয়ই খারাপ
লাগছে?নিজের ওপর অনেক রাগও হচ্ছে।বার
বার ভাবছেন কেন ছেড়ে এলাম? কেন ছেড়ে
এলাম? জানি জানি এবার কি বলবেন। বলবেন,
জানো শুভ? তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার খুব
কষ্ট হয়েছে।বারবার ফিরে পেতে চেয়েছি
তবে পারিনি। আরও বলবেন ,আমি তোমাকে
এখনো অনেক ভালবাসি, অনেক অনেক বেশী
ভালবাসি।তুমি কি আমায় ফিরিয়ে নেবে?
এসব কথা বলতে বলতে উঠে তার পাশে গিয়ে
দাঁড়ালাম।
-তার চোখ পুরো লাল হয়ে আছে। চোখ ফেটে
অনরগর পানি পরছে।তার এ চেহারা দেখে খুব
কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে নিজের হৃদয়ে নিজেই
আঘাত করছি,কিন্তু জীবন যাচ্ছে না,শুধু
আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
আমার পকেট থেকে সেই আংটি টা বের করে
বললাম, সেদিন তোমায় এটা পড়াতে
চেয়েছিলাম, ২ টি কথা শুনেই তুমি চলে
গেছো। একবারও ফিরে তাকাওনি, আমি
সেখানেই দাঁড়িয়েছিলাম। তোমাকে
বলেছিলাম না? নিজ পায়ে দাড়িয়েই
তোমার বাসায় যাব, তোমার হাত ধরে নিয়ে
আসব।তবে তুমি বিশ্বাস রাখনি! সেদিন তুমি
কিছু বলার সুযোগ দাও নি, ভালোই হয়েছে
তোমার আসল রুপ টা আজ চিনতে পারলাম।তবে
দুঃখিত, আমি তোমার বয় ফ্রেন্ড এর কোনো
সাহায্য করতে পারব না। তুমি এবার আসতে
পার।
-কান্নায় তার পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে।
নিরবতা কাটিয়ে বলল, তুমি আমায় আজ ও
চিনতে পারলে না শুভ! বলেই সিভি র খাম টা
আমার দিকে বারিয়ে দিল।বলল, যার কম্পান্যি
তার আবার কিসের চাকরি?
-কিছু না বলেই খামটা খুলে দেখলাম।ভেতরে
দেখি হুবুহু আমারমতো চেহারার একটি ছেলের
ছবি।সে কি!পাশে আমার নাম লেখা!!
-আরও ৩ টি অফিসে আবেদন করেছিলাম,
কোনো কাজ হয়নি।বলেই সে জোরে জোরে
কাঁদতে লাগল।
আর আমি? তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া
আমার আর কিয়বা করার আছে? ভাবছি আগে
জড়িয়ে ধরব নাকি ক্ষমা চাইব
Please Rate This Post