সকালের ইরা কে
সকালের ইরা কে


সকালের নাস্তার টেবিলে ইরা কে কেমন
যেন গম্ভীর দেখলাম । আমি নাস্তা করছিলাম ।
ও চুপচাপ বসে ছিল । কিছু খাচ্ছিল না । বললাম
-কি ব্যাপার খাচ্ছ না কেন ?
-এখন খেতে ইচ্ছা করছে না ।


-এখন করছে না মানে কি ? অফিসে যাবে না ?
-আজকে ভাবছি অফিসে যাবো না ।
-কেন ? শরীর ভাল আছে তো ? জ্বর আসেনি
তো ?
আমি ইরার কপালে হাত দিলাম ।
-না তেমন কিছুই হয়নি । এমনি ইচ্ছা করছে না ।
আমি নাসতা খেয়ে উঠতে যাবো এমন সময়
দেখলাম ইরা আমার হাত ধরে বসাল । বলল
-কাল রাতে ঘটনার জন্য আমি সরি । খুব বেশি
সরি ।
-না ঠিক আছে । কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলাম না
তুমি এমনটা কেন করলে ?
ইরা বলল
-তুমি জয়িতার সাথে কথা বলছিলে এটা আমার
একদম সহ্য হচ্ছিল না । বারবার মনে হচ্ছিল আমার
কাছ থেকে কি যেন হারিয়ে যাচ্ছে । মনে
হচ্ছিল আমার কিছু একটা অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে

বলতে বলতে ইরা বাচ্চা মেয়েদের মত কেঁদে
ফেলল । চেয়ার থেকে উঠে ওকে জড়িয়ে
ধরলাম । বললাম
-বোকা মেয়ে ! আমি তোমার হাজবেন্ড !
তোমার কাছ থেকে কে আমাকে নিয়ে যাবে
বল ?
ইরা আমাকে আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ।
যেন আমি কোথাও হারিয়ে যাচ্চি ।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল
-কিন্তু জতিয়াকে তো তুমি ভালবাসতে ।
-বাসতাম । ও তো আমার পাস্ট । আর তুমি আমার
প্রেজেন্ট আর ফিউচার । তুমি কেন ওর সাথে
নিজেকে তুলনা করছো ?
-আমি জানি না । তুমি আর ওর সাথে কথা বলবা
না ।
-আচ্ছা বাবা বলবো না । আর জয়িতা অল্প কয়েক
দিনের জন্য এসেছে । ও চলে যাবে । কেবল
ভার্সিটির রিইউনিয়নের জন্য এসেছিল । আমি
এবার অফিসে যাই ?
-আচ্ছা । ইরা একটু হাসলো ।
ইরাকে একটা মিথ্যা কথা বলতে হল দেখে একটু
খারাপই লাগছে । ওকে বললাম যে জয়িতার
সাথে আর দেখা করবো না । কিন্তু দেখা না
করলে কিভাবে হয় ? গত কাল ওর সাথে ঠিকমত
কথা হয় নি ।
আমি খুব ভাল করেই জানি জয়িতা কেবল আমার
সাথেই দেখা করার জন্য দেশে এসেছে । ঘর
থেকে বেরতে না বেরতেই জয়িতার ফোন ।
-বল ।
-তোমার হ্যালো না বলার অভ্যাসটা আর গেল
না , না ?
আমি হাসলাম ।
-মন ভাল তোমার ?
জয়িতারও দেখছি অভ্যাসটা যাই নি । ও সব সময়
ফোন করে আমাকে জিজ্ঞেস করত মন ভাল
কিনা । যদি একবার ফোন রেখে ১০ মিনিট পরে
আবার ফোন দিতাম তবুও এই প্রশ্নটা করতোই ও ।
একবার কি হয়েছে । ওর সাথে খুব ঝগড়া হয়েছে
। একবার ঝাড়ি দিয়ে ফোন রেখেছি । কিছুক্ষন
পর আবার ফোন দিয়েছি আরেক দফা ঝাড়ি
দেবার জন্য । ফোন রিসিফ করেই জয়িতা খুব
আদুরে গলায় বলল
-মন ভাল তোমার ?
এমনিতে আমরা একে অপরকে তুই করে বলতাম ।
কিন্তু মাঝে সাঝে ও আমাকে তুমি করে বলত ।
বিশেষ করে যখন আমি রেগে যেতাম ।
আমি আর কিছু বলতেই পারলাম না । এই
মেয়েকে কি বেশি কিছু বলা যায় ?
-তোমায়ও তো অভ্যাসটা যায় নি ?
জয়িতা বলল
-তুমি আসছো তো ?
-হুম । আসবো না কেন ?
-না মানে , তোমার ওয়াফ পছন্দ নাও করতে
পারে ।
-ইরা পছন্দ করবে না ।
-তবুও আসবে ?
-হুম আসবো ।
– কেন ?
-জয়ি ইরা আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট । কিন্তু তুমিও
আমার কাছে কম জরুরী না !
-আচ্ছা ! বুঝলাম । এসো তাহলে ! কেমন ? আমি
অপেক্ষা করছি ।
আমি ফোন কেটে দিলাম । রিক্সাওয়ালাকে
এলিফ্যান্ট রোডের দিকে যেতে বললাম ।
জয়িতার এক মামার বাড়ি ঐ দিকটায় । আপাতত
জয়ি ওখানেই উঠেছে ।
আজ কতদিন পর জয়িতার সাথে দেখা করতে
যাচ্ছি । প্রায় সাত বছর তো হবেই । আজ কতদিন পর
ওর সাথে একটু কথা বলব ভালভাবে । আগে এমন
কোন দিন ছিল না যে আমরা দেখা করতাম না ।
আমার এখনও খুব ভাল করে মনে আছে ওকে
যেদিন প্রোপজ করি । ও খানিকটা অবাক হলেও
নিজেকে সামলে নিয়েছিল । বলল
-দেখ আবীর ইটস নট ফানি ।
-আরে ফানির কি দেখলি ? তোকে প্রোপজ
করেছি আমি ।
-ওয়েল দেন আই ক্যান রিজেক্ট ইউ ইফ আই ওয়ান্ট ।
-রিজেক্ট করেই দেখ !
জয়িতা কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ।
বলল
-তুই যেটা চাচ্ছিস সেটা সম্ভব না ।
– কেন সম্ভব না ? আমাকে তুই একটা যুক্তি যুক্ত
কারন দেখা ।
-দেখ আবীর তুই কি জোর করে আমার মুখ থেকে
হ্যা বলাবি ?
-প্রয়োজন হলে তাই ।
জয়িতা কি বলবে ভেবে পেল না । আমি
বললাম
-তুই আমাকে রিফিউজ কেন করবি বল ? একটা
কারন আমাকে দেখা ।
জয়িতা এবারও কোন কথা বলল না । কেবল আমার
দিকে তাকিয়ে থাকল ।
-বল আমাকে অপছন্দ করিস ? বল । করিস অপছন্থ ?
জয়ি মাথা নাড়ল ।
-অন্য কাউকে ভালবাসিস ?
এবার ও মাথা নাড়ল ।
-আমি যদি অন্য কোন মেয়ের সাথে এঙ্গেইজ হই ,
তোর ভাল লাগবে ?
জয়িতা কোন উত্তর দিলো না ।
– কি কথা বলছিস না কেন ?
জয়িতা ক্ষীন গলায় বলল
-তুই কারো সাথে এঙ্গেইজ হলে আমার কি ?
– কি বললি তুই ? আমার কি ? তাহলে ঐ দিন তুই
রেগে গিয়েছিলি ক্যান ?
-কোন দিন ?
-পহেলা বৈশাখের দিন । আমি তোকে বাদ
দিয়ে নীলুর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । তুই
রেগে গিয়েছিলি কেন ? পুরো এক দিন আমার
সাথে কথা বলিস নি মনে আছে ।
-আহা রাগবো না ? আমি তোমার জন্য
সেজেগুজে আসবো আর তুমি অন্য মেয়ের সাথে
ঘুরে বেড়াবা !
-তাহলে ?
-তাহলে কি ?
-তুই কি বুঝতে পারছিস না নাকি বুঝতে
চাচ্ছিস না ?
জয়িতা অন্য দিকে তাকালো । আমি হাত
দিয়ে ওর মুখটা স্পর্শ করলাম । দেখলাম ওর চোখে
পানি চলে এসেছে । ওর চোখের পানি মুছে
দিতে দিতে বললাম
-জয়ি , তুই এমন কেন করছিস বলবি আমাকে ?
-আবীর প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা কর । এই সম্পর্ক
কেবল কষ্টই দেবে । আর কিছু না ।
-আমি আর কিছু জানি না । আমি আজ রাত
তোকে সময় দিলাম । তুই যদি কাল সকালের আগে
আমাকে ফোন না দিস এবং……
বলে একটু থাকলাম । জয়িতা বলল
-এবং ?
-এবং তোর আনসার যদি পজেটিভ না হয় তাহলে
দেখিস । আমি গেলাম ।
আমি জানতাম জয়িতা ফোন করবেই । রাত
আড়াটার দিকে জয়িতার ফোন এসে হাজির ।
-কি করিস ?
-ছাদের উপর বসে আছি ।
-ছাদের উপর কি করিস ?
-জায়গা খুজছি ?
– কেন ?
-না কোন জায়গা থেকে লাফ মারবো তাই
ঠিক করছি ।
-আবীর মার খাবি কিন্তু । তুই এক্ষনি রুমে আয় ।
এক্ষনি আয় ।
-আগে হ্যা বল ।
-আবীর প্লিজ রুমে আয় । প্লিজ ।
আমি হেসে উঠলাম । বললাম
-ভয় নাই । আমি রুমেই আছি । তোকে একটু ভয়
দেখালাম ।
জয়িতা কোন চুপ করে থাকল । কথা বলল না ।
আমি বললাম
-কি হল কথা বলছিস না কেন ?
একটু কান্নার আওয়াজ পেলাম ।
-আরে কাঁদছি কেন ?
-তুই সব সময় আমাকে জ্বালাতন করিস । তুই জানিস
না তুই আমার কাছে কি ?
-জানি তো !
-তাহলে এমন কেন করিস ?
-আই লাভ ইউ বল ।
জয়িতা হাসল ।
– তুই এতো বোকা কেন ? সব কথা কি বলার দরকার
হয় ।
-না । তবুও বল ।
-আচ্ছা বাবা বলছি ।
জয়িতা একটু চুপ করল ।
জয়িতার বাসায় পৌছাতে পৌছাতে ঘন্টা
খানেক লেগে গেল । আগে অনেক বার এসেছি
এই বাড়িটার সামনে । জয়িতা প্রায়ই আবদার
করতো ওকে বাসা থেকে নিয়ে যেতে । কিন্তু
একটা ব্যাপার প্রায়ই হত । আমি যখনই ওর বাড়ির
সামনে এসে হাজির হতাম ঠিক তখনই ওর ফোন
আসতো আমার মোবাইলে । ফোন করে বলতো
-বেল বাজাবি না । আমি নামছি ।
আমার মনে হত ও আমার জন্য জানলা দিয়ে
তাকিয়েই থাকতো । আমাকে বেল বাজানোর
সুযোগ দিতো না । কিন্তু আজ আর ঐ রকম কিছু হল
না । আমি কিছুটা সময় অপেক্ষা করলাম যদি ওর
ফোন আসে ! শেষে নিজেই ফোন দিলাম ।
-চলে এসেছো ?
-হুম ।
-উপরে এসো । তিন তালার বা পাশের ফ্লাট ।
মনে নেই তোমার ?
আমার প্রতি ও আগে থেকেই আসক্ত ছিল কিন্তু
হ্যা বলার পর থেকে আমি ছাড়া আর কিছু যেন
বুঝতোই না । সেই সকাল বেলা থেকে আমাদের
একসাথে পথ চলা শুরু হত দুপুর বেলা পর্যন্ত চলত । যে
দিন মাত্র একটা ক্লাস থাকতো সেই দিনও
পুরোটা সময় একসাথে থাকা চাই ।
ওর এমন আচরন করাটা হয়তো আমি বুঝতে পারতাম
। জয়িতা তখন সিক্সে পড়ত যখন ওর বাবা মার
ডিভোর্স হয়ে যায় । ও বাবা মা কারো কাছেই
থাকে নি । সত্যি কথা বলতে ওর বাবা মা ইচ্ছা
করেই জয়িতাকে নিজের কাছে রাখে নি ।
মাসে মাসে কেবল খরচ পাঠিয়ে দিতেন ।
কিন্তু ভালবাসা পাঠান নি কখনও ।
জয়িতা বলতে গেলে তারপর থেকে
হোস্টেলেই বড় হয়েছে । মাঝে মাঝে যেত ওর
মামার বাড়িতে । কারো কাছ থেকে না ঠিক
মত ভালবাসা পেয়েছে আর না কাউকে ঠিক মত
ভালবাসতে পেরেছে । তাই আমাকে পাবার
পর থেকে যেন এতো দিনের সব না পাওয়া
ভালবাসা আমার কাছ থেকে পুষিয়ে নিচ্ছিল

কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে সব সময় খুব
অদ্ভুদ লাগতো । ও কথনই আমার বিয়ের কথা বলত
না । কেমন যেন এড়িয়ে যেত । পড়া লেখা শেষ
করে যখন চাকরীতে ঢুকলাম স্বাভাবিক ভাবেই
ওকে বিয়ে করতে চাইলাম । ও বলল
-তোর ফ্যামিলির সাথে আগে কথা বল ।
আমি আমার মাকে বললাম । সব শুনে মা রাজি
হলেন না । তার এক কথা ব্রোকেন ফ্যামিলির
কোন মেয়ে তার ছেলের বউ হবে না । কত
ভাবে বোঝাতে চাইলাম কিন্তু কিছুতেই
মাকে রাজি করাতে পারলাম না ।
কথা গুলো যখন জয়িতা কে বললাম ও একটুও অবাক
হল না। ওর মুখ দেখে বুঝলাম ও যেন আগে থেকেই
জানতো এমনটা হবে ।
কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে গেল । আমি
ভেবেছিলাম জয়িতাকে দেখবো । কিন্তু
দরজা খুলল পাঁচ ছয় বছরেয় একটা মেয়ে । এতো
মিষ্টি চেহারা মেয়েটার । আমাকে দেখে
মিষ্টি একটু হাসল । আর কেবল আমার দিকেই
তাকিয়ে থাকল ।
আমি বললাম
-তোমার নাম কি ?
-তোমাকে কেন বলব ?
-শশী এসব কি হচ্ছে ?
জয়িতাকে ঘরে ঢুকতে দেখলাম ।
-কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে নাম বলতে হয় !
জানো না?
ছোট্ট মেয়েটা গিয়ে জয়িতাকে জরিয়ে ধরল

জয়িতা আগের মতই আছে । গতকালকের
অনুষ্ঠানে ইরার জন্য ওকে ঠিক মত দেখতে পারি
নি । আমি বললাম
-ভাল আছো তো ?
-তুমি এসেছো না ! এখন ভাল আছি ।
-আগের মতই আছো ?
জয়িতা হাসল ।
-আচ্ছা এই মিষ্টি মেয়েটা কে ?
জয়িতা শশীকে কোলে নিল । জয়িতা হাসল ।
জয়িতাকে হাসতে দেখে শশীও হাসল ।
জয়িতা বলল
-বলতো কে ?
-ওমাইগড ! এটা তোমার মেয়ে ? সত্যি তোমার
মেয়ে ? এতো বড় হয়ে গেছে ? দেখি একটু
কোলে নেই ।
শশীকে কোলে নিলাম । কেমন যেন আফসোস হল
নিজের মনের মধ্যে । এই মিষ্টি মেয়েটা
আমার নিজের হতে পারতো ! কোলে নিতেই
শশী আমাকে জড়িয়ে ধরল । একটা ভাল লাগা
বয়ে গেল আমার পুরো মন জুরে ।
-এতো মিষ্টি মেয়ে তোমার ?
তারপর থেকে জয়িতা যেন কেমন বদলে
গিয়েছিল । আমার দিকে যখন তাকাত কেমন
যেন একটা বিষন্নতা ওর চেহারায় ফুটে ওঠত ।
মনে হত ওর কাছ থেকে কি যেন একটা হারিয়ে
যাচ্ছে । আর ও সেই জিনিসটাকে ধরে রাখার
জন্য কিছুই করতে পারছে না । আমি কত কথা
বলতাম । ও কিছু বলত না । আমি আর থাকতে
পেরে ওকে বললাম
-তুই এমন কেন করছিস ?
-কেমন করছি ?
-এমন মন খারাপ করে কেন থাকিস ?
জয়িতা কোন জবাব দিল না । আমি বললাম
-আমি তোকেই বিয়ে করবো ! কে রাজি হোক
বা না হোক ! তুই বুজলি আমার কথা ?
জয়িতা হাসল । বিষন্নতার হাসি !
-আবীর ! আমি তোকে বিয়ে করবো না । তুই কি
জানিস মানুষের জীবনে মা বাবা কতটা
ইম্পর্টেন্ট ! তাদের কাছে থাকাটা কত বেশি
জরুরী ! অনেক বেশি জরুরী ।
-কিন্তু ..
-কোন কিন্তু না । তোর মা তোকে ২৪ বছর ধরে
ভালবাসে । বুকের একটু একটু ভালবাসা দিয়ে
তোকে বড় করেছে । আমার ২৪ মাসের
ভালবাসা ঐ ২৪ বছরের ভালবাসার কাছে কিছুই
না । তোর মাকে কিছুতেই কষ্ট দিস না । আমি
হলে দিতাম না । তোরও দেওয়া উচিৎ না ।
তারপর থেকে জয়িতা আমার সাথে
যোগাযোগ কমিয়ে দিল । আমি যোগাযোগ
করতে চাইলেও ও করতো না ।
আবার বললাম
-তোমার মেয়েটা এতো মিষ্টি হয়েছে ! একদম
তোমার মত । দেখতেও হয়েছে একদম তোমার মত ।
জয়িতা হাসল । এর চোখ দুটোতে কেমন যেন
একটা রহস্য দেখলাম । ও বলল
-সবকিছু কিন্তু আমার মত না । চোখ দুটো হয়েছে
একদম ওর বাবার মত ।
আমি শশীর চোখের দিকে তাকালাম । আসলেই
শশীর চোখ দুটো জয়িতার মত না । কেন জানি
চোখ দুটো আমার বড় পরিচিত মনে হল । কার মত এই
চোখ দুটো ! তবে যার মতই হোক বড় পরিচিত মনে
হল ।
শশী এখনও আমার কোল থেকে নামে নি ।
আমাকে কেমন জড়িয়ে ধরে রেখেছে । হঠাৎ
জয়িতা ওর মোবাইল দিয়ে আমাদের ছবি তুলল ।
বেশ কয়েকটা । আমি বললাম
-কি করছো ?
-আমার মেয়ের জন্য ছবি তুলছি ? তুমি যখন
থাকবে না এই ছবি ওকে তোমার কথা মনে
করাবে ।
আমি ঠিক মানে বুঝলাম না । কেবল হাসলাম ।
জয়ি শশীকে বলল
-মামনি তুমি একটু ভিতরে যাও ! আমি একটু
আবীরের সাথে কথা বলি !
-আমি থাকি না আম্মু ! বাবার সাথেতো আর
থাকতে পারবো না ।
কথাটা শুনে আমি ধাক্কার মত খেলাম । শশী কি
বলল ! বাবা !!
আমার ঠিক তখনই মনে পরে গেল শশীর চোখ দুটো
কেন এতো পরিচিত মনে হচ্ছিল । আয়নার দিকে
চোখ পড়লে যে ঐ দুচোখ প্রতিদিন আমি দেখি ।
আমার বুকের মধ্যে কেমন একটা অনুভুতি শুরু হল ।
আমি জয়িতার দিকে তাকালাম । জয়িতার
চোখ দুটো কেমন যেন অস্বস্থির । এদিক ওদিক
ঘোরাঘুরি করছে ।
জয়িতার খোজ পাচ্ছিলাম না কিছুদিন
থেকেই । কোথায় যেন ডুব মেরেছে । ওর ফোনও
বন্ধ । একদিন হঠাত্ করেই আমার বাসায় এসে
হাজির । ঐ দিন বাসায় একলা ছিলাম । মা
গ্রামের বাসায় গেছিল । রাত তখন প্রায়
এগারটা বাজে । এমন সময় জয়িতা এসে হাজির ।
ওকে এতো রাতে আসতে দেখে খানিকটা
অবাক না হয়ে পারলাম না ।
-এতো রাতে ? এতো দিন কোথায় ছিলি ? আর
তোর এই অবস্থা কেন ?
জয়িতাকে কেমন জানি এবনরমাল মনে হচ্চিল ।
একটু যেন টলছিল । জয়িতা বলল
-ড্রিংক করেছি ।
-মানে ? কেন?
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম । কি বলে এই
মেয়ে ? খানিকটা ধরেই ওকে ঘরের ভেতরে
নিয়ে এলাম । ওর কেমন জানি হুস নাই মনে হল ।
আমাকে বিড় বিড় করে বলল
-খুব ঘুম আসরে আবীর । একটু ঘুম পাড়িয়ে দিবি ?
-আয় ।
ওকে নিয়ে শোবার ঘরের দিকে গেলাম ।
যাওয়ার পথেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরলে । যখন
ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম জয়ি তখনও
আমাকে ছেড়ে দিলো না । ঘোলা চোখ
নিয়ে আমাকে বলল
-একটু আদর করবি আবীর ?
আমার প্রথমে মনে হল ওর হয়তো হুস নেই তাই কি
করছে না করছে তার ঠিক নেই । কিন্তু ওর
চোখের দিকে যখন ভাল করে তাকালাম আমার
পুরো শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল । আমি
নিজেকে আর সংবরন করতে পারলাম না ।
সেদিন আমার কি হয়েছিল জানি না কিন্তু
মনে হয়েছিল জয়িতাকে এর আগে কথনও এতো
আপন করে ভালবাসি নি । রাতে ঘুমানোর
আগে কেবল এই কথাটা মনে হল এই জয়িতাকে
ছাড়া আমার চলবে না কিছুতেই ।
কিন্তু সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জয়িতাকে
আর দেখতে পেলাম না । কেবল আমার
মোবাইলের নিচে চাপা দেওয়া এক টুকরো
কাগজ পেলাম ওর । এলোমেলো হাতে লেখা
অল্প কয়েকটা লাইন
আর কয়েক ঘন্টা পরেই আমার ফ্লাইট । বাবা
কাছে যাচ্ছি । তোকে ছেড়ে যাচ্ছি । কাল এ
কথাটাই বলতে এসেছিলাম । যেন বলতে পারি
তাই খানিকটা ড্রিংক করে এসেছিলাম । তবুও
বলতে পারি নি । তারবদলে কি হয়ে গেল দেখ !
যাগ গে তুই টেনশন নিস না । যা হয়েছে ভালই
হয়েছে । তুই ভাল থাকিস । আর আমার কথা মনে
রাখিস । তোকে অনেক ভালবাসি ।
আমি কোন মতে বললাম
-শশী কি বলল আমাকে ?
জয়ি চুপ করে থাকলো অনেকক্ষন ।
– কি ব্যাপার কথা বলছো না কেন?
তারপর হঠাৎ করেই জয়ি কথা বলা শুরু করলো ।
-যখন বাবার কাছে পৌছালাম তখনও আমি
ভেবে পাই নি আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো
। কিন্তু ওখানে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই আমি
টের পেলাম আমার মধ্যে কিছু একটা হয়েছে ।
যখন সিওর হলাম কি যে আনন্দ লাগছি আমার
কাছে ! তুমি নেই তবুও তোমার অস্তিত্ব আমার
কাছে আছে । আমার বাঁচার অবলম্বন ।
-আমাকে তুমি একবার জানাতে পারতা না ?
জয়িতা হাসলো !
-তাহলে তোমাকে আটকানো বড় কঠিন হয়ে
যেত ।
অনেক কিছু বলতে চাইলাম । কিন্তু তারপর মনে
হল কি দরকার ? কি লাভ এখন এসব জিজ্ঞেস করে !
আমি কেবল শশীকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম ।
আমার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম ।
জয়িতা বলল
-শশী জন্মাবার পর থেকে আমার পুরো জীবনটাই
যেন বদলে গেল । আমার পুরোটা সময়ই কাটতো
ওকে নিয়ে । জানে ওকে যখন জয়িয়ে ধরতাম
মনে হত যেন তোমার গন্ধ আমি পাচ্ছি ওর গা
থেকে ।
আমি বললাম
-কোন অসুবিধা হয় নি তোমার ? না মানে তুমি
একা একটা মেয়ে হয়ে …. !
জয়িতা হাসল ।
-নাহ ! তেমন কোন সমস্যায় পরতে হয় নি । বোঝই
তো ওখানকার কালচারটা মোটামুটি এরকম ।
অবশ্য বাবা প্রথম প্রথম একটু নাখোস ছিল । কিন্তু
পরে আর কিছু বলে নি ।
আমি বললাম সব
-তো ভালই চলছিল । তাহলে দেশে কেন এলে ?
-গত বছর শশী ওর বাবাকে দেখার জন্য খুব
চিত্কার চেচামিচি শুরু করে দিল । স্কুলে সবার
বাবা আসে ওর বাবা কেন আসে না । বাবা কই ?
বাবা কই ? এই নিয়েই সারাদিন কান্নাকাটি
চলত । তাই ওকে প্রমিজ করেছিলাম যে সামনের
জন্মদিনে তোমার বাবাকে এনে দিবো ।
আমি কিছু বললাম না । শশীর দিকে তাকিয়ে
রইলাম । কি শান্ত ভঙ্গিতেই না ও আমাকে
জড়িয়ে ধরে আছে । জয়িতা আবার বলল
-আমি ভেবেছিলাম ওর হয়তো মনে থাকবে না
। কিন্তু শশী ওর বাবার কথা ভুলে যাই নি । এই
বার আর কিছুতেই ওকে সামলাতে পারছিল না ।
তোমার মেয়ে না ? তোমার মতই হয়েছে ।
একবার কিছুতে হ্যা বললে আর না বলার উপায়
নাই ।
আমি শশীকে কোলে নিয়েই বসে রইলাম
অনেকক্ষন । কোন কথা বললাম না । কেবল বসেই
রইলাম । খুব ইচ্ছা করছিল শশীর সাথে কথা বলি
কিন্তু কোথা থেকে যেন একটা বাঁধা আসছিল
বারেবার ।
যখন আমার ফেরার সময় হল শশীকে কোল থেকে
নামালাম । শশী বলল
-তুমি কি এখন চলে যাবে ?
আমি কথাটার জবাব দিতে পারলাম না । কেন
জানি মনে হচ্ছিল এখনই আমার চোখে পানি
চলে আসবে । পকেটে যা টাকা ছিল প্রায় সবটুকু
শশীর হাতে তুলে দিলাম । ওকে বললাম
-মামনি তোমার যা ইচ্ছে কিনে নিও ।
জয়িতা বলল
-কেউ কিছু দিলে থ্যাঙ্কিউ দিতে হয় !
-থ্যাঙ্কিউ ।
মা মেয়ে দুজনেই একদম নীচ পর্যন্ত এল আমাকে
এগিয়ে দিতে । যাবার আগে জয়িতা আমাকে
বলল
-আবীর তুমি মনে কখনও যেন কোন অপরাধ বোধ
রেখো না । কেমন ! হয়তো তোমার সাথে
থাকলে আমি আরো একটু ভাল থাকতাম । তবে
এখন কিন্তু আমি খারাপ নেই । বরং অনেক ভাল
আছি । তুমিও ভাল থেকো কেমন ।
আমি রিক্সায় উঠে পড়লাম । শশীকে বললাম
-ভাল থেকো মামনি ।
-তুমিও ।
মিষ্টি একটু হাসল । শশীর ঐ হাসিটুকু দেখে
সত্যি বুকের মধ্যে কেমন যেন এক অজানা
শূন্যতার সৃষ্টি হল । জয়িতা যখন আমাকে ছেড়ে
গেছিল তখন যেমন ওর প্রয়োজনীতা অনুভব করতাম
। আজও ওর অভাব অনুভুত হচ্ছে । ওদের দুজনের
অভাব !
-ছার আপনে কানছেন ক্যান ?
-হুম কি বললে ?
রিক্সায়ালার কথায় বাস্তবে ফিরে এলাম ।
চোখে হাত দিয়ে দেখলাম সত্যিই আমার
পানি পরছে ।
-না ঠিক কাঁদছি না । চোখের মধ্যে কি যেন
এসে পরেছে তাই পানি পরছে ।
রিক্সা এগিয়ে চলছে টুংটাং শব্দ করে । আমিও
এগিয়ে চলেছি এক জীবনকে পিছনে ফেলে
অন্য এক জীবনের কাছে
Please Rate This Post