![]() |
| খুব বিপদে আছে |
শি আজ খুব বিপদে আছে। সকাল সকাল তার ছোট বোন খুশি এসে জানতে চেয়েছে, “ভাইয়া, মশা বড় না হাতি বড়?”
মুশি রেগেমেগে জবাব দিয়েছে, “ফাজলামি করার জায়গা পাস না, তাই না? হাতি বড় হবে না তো কে হবে? তোর চোখ নেই? দেখে বুঝিস না?”
খুশি আমতা আমতা করে বললো, “না মানে অন্যদিক থেকে চিন্তা করলে…”
মুশি রেগেমেগে জবাব দিয়েছে, “ফাজলামি করার জায়গা পাস না, তাই না? হাতি বড় হবে না তো কে হবে? তোর চোখ নেই? দেখে বুঝিস না?”
খুশি আমতা আমতা করে বললো, “না মানে অন্যদিক থেকে চিন্তা করলে…”
লাইনটা শেষ করার আগে তেড়ে আসে মুশি। নিশ্চিত ধোলাই থেকে বাঁচতে দৌঁড়ে পালায় খুশি।
মুশি নিজের ঘরে ফেরে ঠিকই, কিন্তু চিন্তায় পড়ে যায়। মশার সাথেই কেন হাতির তুলনা করলো খুশি? পিঁপড়ার সাথে হাতি কিংবা মশার সাথে তিমি মাছের তুলনাও তো হতে পারতো! ঘটনাটা কী তা বোঝার জন্য খুশির কাছে জিজ্ঞেস করতেও মন চাইলো না। তবে, ধরেই নিলো এটা ওর উদ্ভট মাথার কোনো চিন্তা। এ নিয়ে ভাববার এমন কিছু নেই।
সব মাথা থেকে বের করে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। বাসার বাইরে পা রাখতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেল । মোড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাদাবাজি করছে একটা হাতি। ঘাড়ের ওপর বসে মাহুত টাকা কালেকশন করছে। ওর হঠাৎ সকালের কথা মনে পড়ে গেল। হাতি আর মশার তুলনার কথা।
আরেকটু কাছে যেতেই অবাক করা ব্যাপার হলো, কিনকিনে চিকন গলায় হাতিটা বলে উঠলো,
“বস্, আপনারে থ্যাংকু। অনেক থ্যাংকু। আপনি আজ সকালে সাহসী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আমরা হাতি কল্যাণ পরিষদ আপনার সঙ্গে আছি। থাকবো।আর আপনিই তো সত্যি বলেছেন।হাতির সাথে মশার তুলনা হয় নাকি আবার!“
রক্ত হিম হয়ে গেল মুশির। হচ্ছে টা কী? হাতি কথা বলছে মানে! আর এই হাতি জানলো কিভাবে সকালের খবর? হিসাব মিলাতে না পেরে উল্টো পায়ে দৌঁড় দিল বাসার দিকে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বাসায় ঢুকেই নিজের রুমে গিয়ে বোতল থেকে পানি খেতে যাবে হঠাৎ দেখে মাথার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে একঝাঁক মশা। উৎকট শব্দ করছে ওরা। এর মধ্যেই মোটাগলায় একটা মশা বলে উঠলো,
“হালার পো, তোর সাহস তো কম না, মশারে ছোট বলার সাহস তোরে কে দিলো? আইজই তোরে সবাই মিল্যা কামড়াইয়া ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, গোদ রোগ সব একসাথে বাঁধাইয়া দিমু”
মুশি এবার অসহায়ের মতো বললো,
“দেখুন, আমি কিছুই জানি না কি হচ্ছে। আমি আমার বক্তব্য উঠিয়ে নিচ্ছি। আমি তো অত কিছু ভেবে বলি নি….”
হঠাৎ জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে ঐ হাতিটা জানালা থেকে শুঁড় গলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোমল কন্ঠে কিন্তু ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা নিয়ে বলে উঠলো,
“বস্। এটা কি ঠিক করলেন? আপনাকে একটা বোদ্ধা মানুষ ভাবছিলাম। স্যরি বস্। আস্তে করে পাড়া দিয়ে আপনার কোমড়টা ভাঙ্গতে হবে দেখছি”
মুশি ভয়ে রান্নাঘরে যেয়ে মায়ের আঁচলের তলে লুকায়। এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর চোখে পড়ে না।এরপর চিৎকার করে খুশিকে ডাকে।
খুশি অপরাধীর মতো মুখ করে এসে দাঁড়াতেই ওকে এক ঝটকায় হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের রুমে গেল। মা কিছু না বুঝতে পেরে খুন্তি হাতে হতবম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
রুমে গিয়ে জানালা দিকে তাকিয়ে দেখলো হাতিটা নেই। মাথার ওপরে মশাটাও নেই। এবার ভয়ে ভয়ে খুশিকে জিজ্ঞেস করলো, “ঘটনা কী রে খুশি?
খুশিও ফিসফিস করে বললো, “ মহাবিপদে আছি ভাইয়া। লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনেছি আজ। রূপকথার। সেখানে একটা গল্প আছে হাতি বনাম মশা। সেই গল্প পড়ে প্রায় শেষ করেছিলাম। শেষ লাইনে এসে দেখি একটা প্রশ্ন লেখা, কে বড়? হাতি না মশা?”
বলতে থাকে খুশি,”এই লাইনটা আসতেই একটা হাতি আর একঝাঁক মশা এসে আমাকে ঘিরে ধরে। দুজনই নানান যুক্তি দিয়ে বোঝাতে থাকে কে বড়।কে সেরা। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমাকেই কেন বলতে হবে? ওরা জবাব দিয়েছে, এই বইটা নাকি ১০০ বছর আগে লেখা। লেখকও মরে গেছে। কিন্তু বইটা কেউ কোনদিন পড়ে নি। আমিই নাকি প্রথম পাঠক। আর বলাই ছিল, প্রথম যে বইটা পড়বে, সে ই সিদ্ধান্ত দেবে কে বড়। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেছি, আমি কিছু জানি না, ভাইয়া জানে। এরপর তো সব তুমি জানোই”
মুশি কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।ভয়ে তোতলাতে আরম্ভ করলো। খুশির কাছে জিজ্ঞেস করলো,
“কি করি বলতো?”
খুশি বললো, “এক কাজ করি ভাইয়া, ওদের প্রতিনিধি ডাকি আজ রাতে। সালিশ হোক। তারপরে তুমি সিদ্ধান্ত দিও কে সেরা।“
হুট করে কোত্থেকে মাথার ওপর মশার ঝাঁক এসে বললো, “আমরা রাজি”
জানালা থেকে হাতিটা মাথা গলিয়ে বললো, “ আমরাও রাজি”
মুশি আর্তনাদ করে উঠলো,”অ্যাই অ্যাই!রাজি মানে? আমি কেন সালিশ করতে যাবো! আমি কি বই পড়েছি নাকি! বইতো পড়েছে খুশি”
খুশি সহ বাকিরা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো,
“না আপনি সিনিয়র, সিদ্ধান্ত আপনাকেই দিতে হবে”
মশা আর হাতির পক্ষ থেকে একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিও অনুভব করলো মুশি। শেষমেষ ঠিক হলো, রাত ১টায় মুশিদের বাসার উঠানে বসবে সালিশ। দুটো হাতি আর একঝাঁক মশা তাতে অংশ নেবে।
এই সিদ্ধান্তের পর খুশি দৌঁড়ে পালালো। বাকিরাও গায়েব। মুশি শুধু মনে মনে ভাবলো, দুঃস্বপ্নও কি কারোর এমন খারাপ হয়? কী এক বিপদ চাপলো ঘাড়ে!
রাত একটা। মুশি আর খুশি পাশাপাশি বসেছে। মশার ঝাঁক হাজির। তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য এসেছে পাড়ার হোৎকা বেড়ালটা।
একটু পরে হাতি দুটোও এলো। আয়েশে কলাগাছ চিবোচ্ছে। ওদের পক্ষে কথা বলবে কে? কাউকে দেখা গেল না। খানিক পরে কোমর দোলাতে দোলাতে এলো পাড়ার মাংসের দোকানের পাশের মোটা কুকুরটা।এসেই শুয়ে ঘুমিয়ে গেল।
মুশি এবার খুব বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে বললো, মশাদের বক্তব্য শুরু হোক।
হোৎকা বেড়ালটা গলা খাকারি দিয়ে বললো, হাতি আর মশার দ্বৈরথটা ঐতিহাসিক। ভেজালটা অবশ্য এরা কেউ লাগায় নি। লাগিয়েছে মানুষ। প্রবাদে বানিয়েছে, হাতি-ঘোড়া গেল তল,মশা বলে কত জল? সেখান থেকেই সংঘাতের শুরু। হাতি এমন কি প্রাণী যে তার সাথে তুলনা দিতে হবে? শুধু সাইজেই বিশাল।
মোটা কুকুরটার ঘুম ভেঙ্গেছে। হাই তুলে বললো, শুধু প্রবাদের কারণে তো তুলনা আসে নি! হাতি এবং মশা দুজনেরই শূঁড় আছে। যা প্রাণীজগতে বিরল। তাই এদেরকে এক কাতারে এনেছে মানুষ। তবে, ভুল করেছে। কারণ, হাতি মহা মূল্যবাণ প্রাণী। মরা হাতির দামই তো লাখ টাকা। আর মরা মশার কোন দাম আছে নাকি?
বেড়ালটা এবার হুংকার দিয়ে ওঠে, মরা মশার দাম দিয়ে কি হবে? মরা মানুষেরই তো কোন দাম নেই। মরে গেলেই লাশ। তাই ওসব যুক্তি দিয়ে লাভ হবে না।
কুকুরটা বলে, তোমরা বাঁচো মোটে তিন-চারদিন। আর আমরা বাঁচি বছর-বছর। মানুষ কত কদর করলে বলতে পারে, গরীবের বাড়িতে হাতির পাড়া!
বিড়াল উত্তর দেয়, আরে রাখো ওসব। আমরা তিনদিন বাঁচলে কি হবে? আমাদের ৩৫০০ টা প্রজাতি আছে। আর তোমাদের প্রজাতি মোটে তিনটা। তোমাদের সংখ্যাও সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা। আর মশার সংখ্যা জানো? অগনিত।
কুকুর এবার একটু নড়েচড়ে বসে, হাতি নিয়ে কতগুলো সিনেমা হয়েছে জানো? জাম্বো, ডাম্বো,হরটন, হাতি মেরে সাথি আরো কত কি! আর তোমাদের নিয়ে ফ্রেঞ্চ একটাই মুভি হয়েছে, তাও আবার মশার সাইজ দেখিয়েছে হাতির মতো!
বিড়াল এবার হালকা একটু হেসে বললো, এবার আসল যুক্তি দেই। পারলে খন্ডাবে। হাতির তো নাকি মহা বড় সাইজ। তা এতই যখন বড়, তখন মানুষের কথায় সার্কাসে নাচো কেন? আর মশা সেই মানুষকেই দিন-রাত নাচাচ্ছে।
কুকুর জবাব খুঁজে পায় না। একটু উ উ উ করে ডেকে ওঠে।
বিড়ালটা বলতেই থাকে, বড় হয় সবাই ক্ষমতায়। হাতির চাদাবাজি করা ছাড়া ক্ষমতাটা কি আছে? তাও তো সেদিন শুনলাম রাস্তায় দৌঁড়ানি খাইসে। আর পেপার-পত্রিকা খুলে দেখো! সব মানুষরে আমাদের এডিস ভাইয়েরা দৌঁড়ানির উপরে রাখসে। অর্থনীতির বড় অংশ এখন মশা মারা ওষুধ, অ্যারোসল, ডেঙ্গুর টেস্ট, ওডোমস, মশারি আর চিকিৎসার পেছনে যাচ্ছে। সেরা কে? বড় কে?
কি যেন বিড়বিড় করে বলতে গিয়েছিল হাতিদুটো। একটা মশা বলে উঠলো, ” আচ্ছা, মানুষকে তো কাইত করা গেছে, হাতিদের একটু কামড়ে দেখবো নাকি ডেঙ্গু হয় কিনা?”
হাতিরা রিস্ক নিতে চায় না। রিস্ক নিতে চায় না মুশি-খুশিও।তাই হাতিদের অকুন্ঠ্য সমর্থনে মুশি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করে দেয়, মশাই বড়ো। মশাই শক্তিশালী।
হাতিদের বেশ বিমর্ষ মনে হয়। কুকুরটা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। মশারা নতুন ফন্দি আঁটছে। তাদের কামড়ে হওয়া গোদরোগের নাম এলিফ্যানটিয়াসিস থেকে বদলে অন্য কোন সুন্দর নাম রাখতে হবে। মশাদের এই তো সময়, যাকে বলে ভরা বসন্ত! নাকি মশাদের জন্য ঋতুর নামও বদলে মশন্ত রাখতে হবে!
গল্প: বড় কে?
মুশি নিজের ঘরে ফেরে ঠিকই, কিন্তু চিন্তায় পড়ে যায়। মশার সাথেই কেন হাতির তুলনা করলো খুশি? পিঁপড়ার সাথে হাতি কিংবা মশার সাথে তিমি মাছের তুলনাও তো হতে পারতো! ঘটনাটা কী তা বোঝার জন্য খুশির কাছে জিজ্ঞেস করতেও মন চাইলো না। তবে, ধরেই নিলো এটা ওর উদ্ভট মাথার কোনো চিন্তা। এ নিয়ে ভাববার এমন কিছু নেই।
সব মাথা থেকে বের করে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। বাসার বাইরে পা রাখতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেল । মোড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাদাবাজি করছে একটা হাতি। ঘাড়ের ওপর বসে মাহুত টাকা কালেকশন করছে। ওর হঠাৎ সকালের কথা মনে পড়ে গেল। হাতি আর মশার তুলনার কথা।
আরেকটু কাছে যেতেই অবাক করা ব্যাপার হলো, কিনকিনে চিকন গলায় হাতিটা বলে উঠলো,
“বস্, আপনারে থ্যাংকু। অনেক থ্যাংকু। আপনি আজ সকালে সাহসী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আমরা হাতি কল্যাণ পরিষদ আপনার সঙ্গে আছি। থাকবো।আর আপনিই তো সত্যি বলেছেন।হাতির সাথে মশার তুলনা হয় নাকি আবার!“
রক্ত হিম হয়ে গেল মুশির। হচ্ছে টা কী? হাতি কথা বলছে মানে! আর এই হাতি জানলো কিভাবে সকালের খবর? হিসাব মিলাতে না পেরে উল্টো পায়ে দৌঁড় দিল বাসার দিকে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বাসায় ঢুকেই নিজের রুমে গিয়ে বোতল থেকে পানি খেতে যাবে হঠাৎ দেখে মাথার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে একঝাঁক মশা। উৎকট শব্দ করছে ওরা। এর মধ্যেই মোটাগলায় একটা মশা বলে উঠলো,
“হালার পো, তোর সাহস তো কম না, মশারে ছোট বলার সাহস তোরে কে দিলো? আইজই তোরে সবাই মিল্যা কামড়াইয়া ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, গোদ রোগ সব একসাথে বাঁধাইয়া দিমু”
মুশি এবার অসহায়ের মতো বললো,
“দেখুন, আমি কিছুই জানি না কি হচ্ছে। আমি আমার বক্তব্য উঠিয়ে নিচ্ছি। আমি তো অত কিছু ভেবে বলি নি….”
হঠাৎ জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে ঐ হাতিটা জানালা থেকে শুঁড় গলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোমল কন্ঠে কিন্তু ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা নিয়ে বলে উঠলো,
“বস্। এটা কি ঠিক করলেন? আপনাকে একটা বোদ্ধা মানুষ ভাবছিলাম। স্যরি বস্। আস্তে করে পাড়া দিয়ে আপনার কোমড়টা ভাঙ্গতে হবে দেখছি”
মুশি ভয়ে রান্নাঘরে যেয়ে মায়ের আঁচলের তলে লুকায়। এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর চোখে পড়ে না।এরপর চিৎকার করে খুশিকে ডাকে।
খুশি অপরাধীর মতো মুখ করে এসে দাঁড়াতেই ওকে এক ঝটকায় হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের রুমে গেল। মা কিছু না বুঝতে পেরে খুন্তি হাতে হতবম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
রুমে গিয়ে জানালা দিকে তাকিয়ে দেখলো হাতিটা নেই। মাথার ওপরে মশাটাও নেই। এবার ভয়ে ভয়ে খুশিকে জিজ্ঞেস করলো, “ঘটনা কী রে খুশি?
খুশিও ফিসফিস করে বললো, “ মহাবিপদে আছি ভাইয়া। লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনেছি আজ। রূপকথার। সেখানে একটা গল্প আছে হাতি বনাম মশা। সেই গল্প পড়ে প্রায় শেষ করেছিলাম। শেষ লাইনে এসে দেখি একটা প্রশ্ন লেখা, কে বড়? হাতি না মশা?”
বলতে থাকে খুশি,”এই লাইনটা আসতেই একটা হাতি আর একঝাঁক মশা এসে আমাকে ঘিরে ধরে। দুজনই নানান যুক্তি দিয়ে বোঝাতে থাকে কে বড়।কে সেরা। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমাকেই কেন বলতে হবে? ওরা জবাব দিয়েছে, এই বইটা নাকি ১০০ বছর আগে লেখা। লেখকও মরে গেছে। কিন্তু বইটা কেউ কোনদিন পড়ে নি। আমিই নাকি প্রথম পাঠক। আর বলাই ছিল, প্রথম যে বইটা পড়বে, সে ই সিদ্ধান্ত দেবে কে বড়। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেছি, আমি কিছু জানি না, ভাইয়া জানে। এরপর তো সব তুমি জানোই”
মুশি কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।ভয়ে তোতলাতে আরম্ভ করলো। খুশির কাছে জিজ্ঞেস করলো,
“কি করি বলতো?”
খুশি বললো, “এক কাজ করি ভাইয়া, ওদের প্রতিনিধি ডাকি আজ রাতে। সালিশ হোক। তারপরে তুমি সিদ্ধান্ত দিও কে সেরা।“
হুট করে কোত্থেকে মাথার ওপর মশার ঝাঁক এসে বললো, “আমরা রাজি”
জানালা থেকে হাতিটা মাথা গলিয়ে বললো, “ আমরাও রাজি”
মুশি আর্তনাদ করে উঠলো,”অ্যাই অ্যাই!রাজি মানে? আমি কেন সালিশ করতে যাবো! আমি কি বই পড়েছি নাকি! বইতো পড়েছে খুশি”
খুশি সহ বাকিরা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো,
“না আপনি সিনিয়র, সিদ্ধান্ত আপনাকেই দিতে হবে”
মশা আর হাতির পক্ষ থেকে একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিও অনুভব করলো মুশি। শেষমেষ ঠিক হলো, রাত ১টায় মুশিদের বাসার উঠানে বসবে সালিশ। দুটো হাতি আর একঝাঁক মশা তাতে অংশ নেবে।
এই সিদ্ধান্তের পর খুশি দৌঁড়ে পালালো। বাকিরাও গায়েব। মুশি শুধু মনে মনে ভাবলো, দুঃস্বপ্নও কি কারোর এমন খারাপ হয়? কী এক বিপদ চাপলো ঘাড়ে!
রাত একটা। মুশি আর খুশি পাশাপাশি বসেছে। মশার ঝাঁক হাজির। তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য এসেছে পাড়ার হোৎকা বেড়ালটা।
একটু পরে হাতি দুটোও এলো। আয়েশে কলাগাছ চিবোচ্ছে। ওদের পক্ষে কথা বলবে কে? কাউকে দেখা গেল না। খানিক পরে কোমর দোলাতে দোলাতে এলো পাড়ার মাংসের দোকানের পাশের মোটা কুকুরটা।এসেই শুয়ে ঘুমিয়ে গেল।
মুশি এবার খুব বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে বললো, মশাদের বক্তব্য শুরু হোক।
হোৎকা বেড়ালটা গলা খাকারি দিয়ে বললো, হাতি আর মশার দ্বৈরথটা ঐতিহাসিক। ভেজালটা অবশ্য এরা কেউ লাগায় নি। লাগিয়েছে মানুষ। প্রবাদে বানিয়েছে, হাতি-ঘোড়া গেল তল,মশা বলে কত জল? সেখান থেকেই সংঘাতের শুরু। হাতি এমন কি প্রাণী যে তার সাথে তুলনা দিতে হবে? শুধু সাইজেই বিশাল।
মোটা কুকুরটার ঘুম ভেঙ্গেছে। হাই তুলে বললো, শুধু প্রবাদের কারণে তো তুলনা আসে নি! হাতি এবং মশা দুজনেরই শূঁড় আছে। যা প্রাণীজগতে বিরল। তাই এদেরকে এক কাতারে এনেছে মানুষ। তবে, ভুল করেছে। কারণ, হাতি মহা মূল্যবাণ প্রাণী। মরা হাতির দামই তো লাখ টাকা। আর মরা মশার কোন দাম আছে নাকি?
বেড়ালটা এবার হুংকার দিয়ে ওঠে, মরা মশার দাম দিয়ে কি হবে? মরা মানুষেরই তো কোন দাম নেই। মরে গেলেই লাশ। তাই ওসব যুক্তি দিয়ে লাভ হবে না।
কুকুরটা বলে, তোমরা বাঁচো মোটে তিন-চারদিন। আর আমরা বাঁচি বছর-বছর। মানুষ কত কদর করলে বলতে পারে, গরীবের বাড়িতে হাতির পাড়া!
বিড়াল উত্তর দেয়, আরে রাখো ওসব। আমরা তিনদিন বাঁচলে কি হবে? আমাদের ৩৫০০ টা প্রজাতি আছে। আর তোমাদের প্রজাতি মোটে তিনটা। তোমাদের সংখ্যাও সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা। আর মশার সংখ্যা জানো? অগনিত।
কুকুর এবার একটু নড়েচড়ে বসে, হাতি নিয়ে কতগুলো সিনেমা হয়েছে জানো? জাম্বো, ডাম্বো,হরটন, হাতি মেরে সাথি আরো কত কি! আর তোমাদের নিয়ে ফ্রেঞ্চ একটাই মুভি হয়েছে, তাও আবার মশার সাইজ দেখিয়েছে হাতির মতো!
বিড়াল এবার হালকা একটু হেসে বললো, এবার আসল যুক্তি দেই। পারলে খন্ডাবে। হাতির তো নাকি মহা বড় সাইজ। তা এতই যখন বড়, তখন মানুষের কথায় সার্কাসে নাচো কেন? আর মশা সেই মানুষকেই দিন-রাত নাচাচ্ছে।
কুকুর জবাব খুঁজে পায় না। একটু উ উ উ করে ডেকে ওঠে।
বিড়ালটা বলতেই থাকে, বড় হয় সবাই ক্ষমতায়। হাতির চাদাবাজি করা ছাড়া ক্ষমতাটা কি আছে? তাও তো সেদিন শুনলাম রাস্তায় দৌঁড়ানি খাইসে। আর পেপার-পত্রিকা খুলে দেখো! সব মানুষরে আমাদের এডিস ভাইয়েরা দৌঁড়ানির উপরে রাখসে। অর্থনীতির বড় অংশ এখন মশা মারা ওষুধ, অ্যারোসল, ডেঙ্গুর টেস্ট, ওডোমস, মশারি আর চিকিৎসার পেছনে যাচ্ছে। সেরা কে? বড় কে?
কি যেন বিড়বিড় করে বলতে গিয়েছিল হাতিদুটো। একটা মশা বলে উঠলো, ” আচ্ছা, মানুষকে তো কাইত করা গেছে, হাতিদের একটু কামড়ে দেখবো নাকি ডেঙ্গু হয় কিনা?”
হাতিরা রিস্ক নিতে চায় না। রিস্ক নিতে চায় না মুশি-খুশিও।তাই হাতিদের অকুন্ঠ্য সমর্থনে মুশি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করে দেয়, মশাই বড়ো। মশাই শক্তিশালী।
হাতিদের বেশ বিমর্ষ মনে হয়। কুকুরটা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। মশারা নতুন ফন্দি আঁটছে। তাদের কামড়ে হওয়া গোদরোগের নাম এলিফ্যানটিয়াসিস থেকে বদলে অন্য কোন সুন্দর নাম রাখতে হবে। মশাদের এই তো সময়, যাকে বলে ভরা বসন্ত! নাকি মশাদের জন্য ঋতুর নামও বদলে মশন্ত রাখতে হবে!
গল্প: বড় কে?

0 Comments