একমাত্র সুইট বউ

একমাত্র সুইট বউ

মনোযোগ সহকারে অফিসে বসে কাজ করছি।কাজ তো নয় পুরো সারা বিশ্বের জটলা পাকানো তার সমাধান দিচ্ছি।গতকাল অফিসে আসিনি তাই সকালে ঢুকতেই ফাইলের স্তুপ জমা পড়েছে।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে।প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে ফাইলগুলো দেখছি।
হঠাৎ,ফোনের রিংটোন বেজে উঠল।

ফাইলের ওপর চোখ রেখেই ল্যান্ড ফোনগুলো বামহাতে চেক করছি।একটাতেও তো কল আসে নি।অবশেষে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করতেই চক্ষু জোড়া বড় হয়ে গেল।যিনি এখন আমাকে স্মরন করছেন মানে কল দিচ্ছেন তিনি আমার একমাত্র সুইট বউ।সুইট বললে ভুল না হলেও অপমান হবে,কারন তিনি একেবারে লঙ্কা গুড়া।একটু এদিক ওদিক হলেই কথা নেই মূহুর্তেই ভুলে যাবে আমি ওর স্বামী।কড়া শাষন করতে একেবারে দক্ষ।তবে শুধু এই খারাপ দিকটাই নেই তার রাগী মেয়েরা যে প্রচন্ড ভালবাসতে জানে তা ওকে দেখে বোঝা যায়।এই রে কলটা তো কেটে গেল,এবার কি হবে।নিশ্চয়ই কথা শুনাবে।তাছাড়া ওর এসময় ফোন দেওয়া মানে হয়ত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে না হলে লাঞ্চ টাইমে বাসায় গিয়ে খেতে হবে ইত্যাদি হাজার বায়না।আবার কল দিয়েছে।রিসিভ করলাম…
-কি এমন রাজকার্যে ব্যস্ত মহারাজ যে ফোন তোলার সময় পাচ্ছেন না।(বউ)
এই হল আমার বউ।ওকে এনে যদি আমার ডেস্কে বসাতে পারতাম বুঝত কাজের চাপ কাহাকে বলে।
-এই তো বসে বসে তোমার কথা ভাবতেছিলাম।(মিষ্টি সুরে জবাব দিলাম)
-মিথ্যে কথা তুমি মোটেও আমার কথা ভাবতেছিলে না।(ধমকের সুরে)
-সত্যিই বলছি তোমাকে নিয়ে ভাবছিলাম।
-সাদিয়া ইসলাম শিউলি কার আইডি?
-কেন বল তো।
-জিজ্ঞাসা করেছি তাই বলবা।
-ও তো আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড।
-বেষ্ট ফ্রেন্ড না?
-হুম।
-চুপ বেহায়া নির্লজ্য কোথাকার ঘরে বউ থাকতে বেষ্ট ফ্রেন্ডের পোষ্টে লুতুপুতু কমেন্ট করতে লজ্জা করে না।
-আজব ব্যাপার।কি বলছ এসব।
-এই একেবারে ন্যাকামো করবে না,তুমি ওর ছবিতে কমেন্ট কর নাই,ও গো বধু সুন্দরী।ঘরের বউকে কখনও একথাটি বলা গেল না আর বাইরের কে না কে তার ছবিতে বলতে হবে।সুন্দরী মেয়ে দেখলে লুচ্চামি করতে মন চায় তাই না।
-দেখ ইপ্সিতা ও জাষ্ট আমার ভাল বন্ধু একেবারে বেষ্ট ফ্রেন্ড ওর একটা ছবিতে আমি বন্ধু হিসেবে কমেন্ট করতে পারিনা।
-হ্যা পার,নাইচ,বিউটিফুল এগুলো কিন্তু তুমি ওইটা বললে কেন,তুমি কি আমাকে নিয়ে সুখী নও।
-ছি ছি এমন কেন বলছ,তুমি ছাড়া আমি কল্পনাই করতে পারব না।
-থাক।তোমার মুখে আর মিথ্যে শুনতে ভাল লাগছে না।
টুট টুট টুটচন্ড বিরক্তি নিয়ে ফোনটা টেবিলের ওপর ছুড়ে মারলাম।একে তো কাজের চাপ তারপর দিল টেনশন বাড়িয়ে।আজ বাসায় গেলে যে কিছু একটা হবে এখনই বুঝতে পারছি।ও হো যার কারনে আমার বউ এত তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে সে আমার স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড সাদিয়া।সকালে ফেবুতে লগ ইন করে দেখি একটা পিক দিয়েছে শাড়ি পরে।তো আমি কমেন্ট বক্সে ও গো বধু সুন্দরী লিখে কমেন্ট করেছি।এই জুকারের যত দোষ।কিভাবে বোধহয় বউয়ের নিউজফিডে চালান হয়ে গেছে শুভ্র কমেন্টেড অন সাদিয়াস ফটো।আর কি তৎক্ষনাৎ কমেন্ট চেক করে আমায় ঝাড়ি শুরু করেছে।নিজের গালে নিজের চড় মারতে ইচ্ছে করে।ভাল লাগেনা এই জীবন,নিজের স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই।আমার আইডিতে ওনাকে ফ্রেন্ডলিষ্টে রাখতে হবে তাও আবার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে শুভ্র ম্যারিড টু ইপ্সিতা রহমান।একেবারে প্রোফাইল পিকচারের পাশে জ্বল জ্বল করবে। সারাদিনে কোন কাজ নাই ফেবুতে ঢুকে আমার ফ্রেন্ডলিষ্ট,লাইক,ফলোয়ার এসব চেক করবে।একটু ত্রুটি পেলে আর রক্ষা নাই।আম্মু আব্বুও তেমন সব দায়িত্ব তাদের বউমার হাতে তুলে দিয়েছে শাষন থেকে খেয়াল সবকিছুই বউ।মাথাটা ব্যাথা করছে।সারাদিনে সাতকাপ চা খেয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম।বুঝতে পারছি যে কোন মূহুর্তে যে কোন কিছু ঘটে যেতে পারে,
টুং টাং,
টুং টাং
কলিং বেল বাজিয়ে দাড়িয়ে আছি,
দরজা খুলতেই অভিমানী মুখ বললে ভুল হবে একেবারে বিরক্তি মাখা মুখটা নিয়ে দাড়িয়ে আছে ইপ্সিতা।
পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।ফ্রেশ হয়ে এসে বললাম খাবার দাও ক্ষুধা লাগছে।
ভ্যাংচি কেটে বলল,খাবার নাই,যাও তোমার সুন্দরী বধুর কাছে গিয়ে চাও।
দেখ ইপ্সিতা আমরা শুধু ভাল বন্ধু আর কিছুনা।
সেটা তোমার মন্ত্যব্য দেখলেই বুঝা যায়।
উফফ কতবার বলব তোমাকে,ও আমার ক্লাসমেট,তবুও যদি আমার অন্যায় হয়ে থাকে আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ।তবু এরকম জঘন্য কথা আর বল না।
হ্যা এখন তো জঘন্য বলেই মনে হবে।সত্য কথা বললে সবার লাগে।
-ঠাশ করে একটা বসিয়ে দিলাম কোনটা সত্যি হ্যা।
কিছু সময় ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকল তারপর ফোস ফোস করে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল।
অফিসের ক্লান্তি,তাপর ওর ঘ্যান ঘ্যান পাগল করে তুলেছে আমায়।নিজের অজান্তেই একটা চড় মেরেছি মুখে।জানি কাজটি করা উচিৎ হয়নি তবুও দিনদিন ওর সন্দেহের মাত্রা বেড়েই চলেছে।
রাতে আর খাওয়া হল না।প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিল,এদিকে ইপসিতাও ঘরথেকে বেরিয়ে গেল,একটা বই পড়ছিলাম,পড়তে পড়তে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।প্রচন্ড ক্ষুধার যন্ত্রনায় মধ্যরাতেই ঘুমটা ভেঙে গেছে।চোখ খুলতেই ঘরটা অন্ধকারে আবিষ্কার করলাম।পাশ ফিরতেই দেখি জড়ো সড়ো হয়ে ইপ্সিতা শুয়ে আছে।মোবাইলের স্ক্রিনের আলোটা জ্বালিয়ে ওর মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম।ইসস চড়টা একটু জোরেই মেরে ফেলেছি,লালচে দাগ পড়েছে মেয়েটির মুখে।ভীষন মায়া হচ্ছে,কান্না পাচ্ছে একটু ছুয়ে দিব কি?নাহ থাক ঘুমাচ্ছে ঘুমোক।
এদিকে ক্ষুধা বেড়েই চলেছে,মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে কিচেনে এসে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করলাম।এখন আবার গরম করবে কে?ক্ষুধার যেমন তাড়া গরম করার অত দেরি সহ্য হবে না।প্লেটে ভাত আর তরকারি নিয়ে মাখিয়ে গালে তুলেছি,বাত্বি জ্বলে উঠল।হা করে আছি,ইপ্সিতা এসে হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে কিচেনে চলে গেল।কি করতে চায় মেয়েটা।প্লেটটা পাশে রেখে বাকি খাবারগুলো গরম করছে।আমি আস্তে আস্তে ওর পিছনে এসে দাড়িয়ে দেখছি।
-আমি তোমাকে শুধু সন্দেহ করি তাই না?(কাঁপা কাঁপা সুরে বলল)
-আমি কি বলব কিছুই বুঝতে পারছিনা।
-আমাকে ছেড়ে একটা ভাল মেয়েকে বিয়ে করে নাও তুমি।তোমার অনেক খেয়াল রাখবে,একটুও সন্দেহ করবে না,অনেক ভালবাসবে।
-আর স্থির থাকতে পারলাম না।হাত ধরে আমার দিকে ফিরালাম।কি বললে তুমি আবার বল
-আরেকটা বিয়ে কর।(কেঁদে কেঁদে)
-একটা থাপ্পড় খেয়েছিস তাতে হয়নি আরও খেতে চাস।
-জানি না।
-আর কখনো যদি বলিস এমন কথা আমি সত্যি সত্যি তোকে মারব।
-বলব যা সত্যি তা বলতে ভয় নেই।
-কোনটা সত্যি?
-আমি তোমাকে সন্দেহ করি এতে তোমার বিরক্তি লাগে।তুমি আমাকে ঘৃনা কর।
-মোটেও না।তুমি যেটা কর একজন স্ত্রী হিসেবে সেটা তোমার করনীয়।
উদাস মুখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষন।তারপর প্লেটে গরম খাবার দিয়ে আমায় খেতে ডাকল।
খেতে বসেছি হঠাৎ খেয়াল হল ও যে জেদি মেয়ে নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে,
-খেয়েছ তুমি?
-চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
-খাও নি কেন?
-ইচ্ছা হয়নি তাই।
-ইচ্ছা হয়নি না আমার উপর রাগ করে।
-আমার কারো উপর রাগ করার অধিকার নেই।
-অভিমান করেছ?
-না।
-দেখ তখন মাথাটা প্রচন্ড গরম হয়েছিল তাই লেগে গেছে আমাকে মাফ করে ।
নিশ্চুপ হয়ে দাড়িয়ে রইল।
ভাত মেখে ওর সামনে ধরলাম।
আমার ভাল লাগছেনা বলে মুখ ঘুরাল।
আমি স্যরিতো।প্লিজ খেয়ে নাও।
আগের মতই স্থির দাড়িয়ে রইল।
তুমি খাবে না তো।ঠিক আছে আমিও খাব না।(বলেই রুমে চলে এলাম)
একটু পরে খাবারের প্লেট হাতে ইপ্সিতা ঘরে ঢুকল।
-নাও খেয়ে নাও।না খেলে শরীর খারাপ করবে।
-তাতে তোমার কি?
-আমার অনেক কিছু খেতে বলেছি তাই খাবে।
-না খাব না।
-আমি খাইয়ে দিলেও না?
-খেতে পারি তোমাকেও খেতে হবে।
চোখের পানি মুছে ভাত মাখিয়ে আমার গালে তুলে দিল।
এবার তুমি নাও বলে আমি ভাত তুলে দিলাম ওর মুখে।
উহু উহু করে কেঁদে আমার বুকে মাথা রেখেছে।
এই বউ কাঁদছ কেন?
-সারাজীবন এমন করে ভালবাসবে তো আমায়?
-হুম তো।তুমি ছাড়া আর কে আছে।
নাও তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তো।
খাবার শেষ করে বিছানায় এসে শুয়েছি আমার বুকে মাথা রেখেছে।
আলতো করে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি আর ও আমাকে একটু একটু করে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরছে।।।।।