![]() |
টপ লেভেলের |
ইউনিভার্সিটির টপ লেভেলের প্লেবয় ছিলো অনি ভাই। তখন সে ইকোনোমিক্স চতুর্থ বর্ষে। ভালো নাম অনির্বাণ আহম্মেদ। স্ট্রেইট চুল, একহাতে একগাদা বেল্ট আর অন্যহাতে বড় ডায়ালের ঘড়ি। শার্ট বা গেঞ্জি যাই পড়তেন না
কেন, কলারটা সবসময় উঠানো থাকতো। মা নাই,বড়লোক বাপের বখে যাওয়া সন্তান বলা চলে। ভদ্রতার ছিটাফোঁটাও নাই তার মধ্যে। তবুও অনি ভাইয়ের প্রতি মেয়েদের আকর্ষণ ছিলো চুম্বকের মতো। জামা কাপড়ের মত মেয়ে বদলাতো সে। প্রতি সপ্তাহে তার নতুন নতুন গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতো। ব্রেকাপ হলে পার্টিও দিতো। সবাই সবটা জানতো কিন্তু তারপরেও মেয়েরা তার প্রেমে সবসময় হাবুডুবু খেতো। সে ছুলেই নাকি মেয়েরা মাখনের মত গলে যেতো। এসব ছিলো শোনা কথা। তার সাথে দেখা হওয়া বা কথা বলার কোনো স্পেস আমার ছিলোনা। আমরা দুইজন দুই মেরুর বাসিন্দা। আলাদা ডিপার্টমেন্ট। আমি তখন ৪০ সাইজের সালোয়ার-কামিজ পড়ে, চুলে দুই বেণী ঝুলিয়ে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা দিয়ে বোটানির ছাল-বাকল নিয়ে মহাব্যস্ত।
তাকে প্রথম দেখি কেমেস্ট্রি ল্যাবে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু রূম্পা কেমেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। সেদিন একসাথে রিভারভিউতে যাবার কথা ছিলো আমাদের। সেই সূত্রে ওকে নিতে ল্যাবে যেতে হয় আমার। কিন্তু ল্যাবে গিয়ে দেখি সেখানে কেউ নাই। আমাকে খুঁজতে সে নাকি আগেই বেরিয়ে গেছে। ল্যাব থেকে বের হওয়ার আগেই হুট করে অনি ভাই ঢুকে দরজা বন্ধ করে আমার পাশে টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়লো। সেই মূহুর্তে ল্যাবে আরো ৫/৬টা বস্তিমার্কা বখাটে এসে বললো,
-“এই মাইয়া,এখানে অনিরে আসতে দেখছিস?”
বুঝলাম এরা পলিটিকাল ছেলেপুলে। আড়চোখে টেবিলের নিচে তাকাতেই হাত জোড় করে ইশারা করছিলো অনি ভাই,যাতে তাদের কিছু না বলি। আমি ভাবলাম কারো উপকার করলে ক্ষতি কি? ছেলেগুলোকে না বলে বিদায় করলাম। ল্যাবে কোনো চেয়ার নেই বলে টেবিলের উপর ফট করে বসে পড়লো সে। হাপাচ্ছিলো বেচারা। আমি তখনো তাকে চিনতাম না। এমনকি ঐ বখাটেগুলো নাম বলে গেলেও সেই কথা মাথায় নাই আমার।তার সদ্য ফোটা পদ্মের মতো চেহারা দেখে তার প্রতি মায়া হলো ভীষণ! ইতস্ততভাবে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম তার দিকে। সে পানি খেয়ে লম্বা একটা দম নিলো। এরপর আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
-“কোন ইয়ার?”
আমি তখন চশমা ঠিক করার ভান করে মাথা নিচু করে বললাম,
-“বোটানি,ফার্স্ট ইয়ার।”
ফার্স্ট ইয়ার কথাটা শোনামাত্র তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো সে। অগ্নিদৃষ্টি হেনে বললো,
-“সিনিয়রদের দেখলে যে সালাম দিতে হয় এটা কেউ শেখায় নাই বেয়াদপ!”
তাকে প্রথম দেখি কেমেস্ট্রি ল্যাবে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু রূম্পা কেমেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। সেদিন একসাথে রিভারভিউতে যাবার কথা ছিলো আমাদের। সেই সূত্রে ওকে নিতে ল্যাবে যেতে হয় আমার। কিন্তু ল্যাবে গিয়ে দেখি সেখানে কেউ নাই। আমাকে খুঁজতে সে নাকি আগেই বেরিয়ে গেছে। ল্যাব থেকে বের হওয়ার আগেই হুট করে অনি ভাই ঢুকে দরজা বন্ধ করে আমার পাশে টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়লো। সেই মূহুর্তে ল্যাবে আরো ৫/৬টা বস্তিমার্কা বখাটে এসে বললো,
-“এই মাইয়া,এখানে অনিরে আসতে দেখছিস?”
বুঝলাম এরা পলিটিকাল ছেলেপুলে। আড়চোখে টেবিলের নিচে তাকাতেই হাত জোড় করে ইশারা করছিলো অনি ভাই,যাতে তাদের কিছু না বলি। আমি ভাবলাম কারো উপকার করলে ক্ষতি কি? ছেলেগুলোকে না বলে বিদায় করলাম। ল্যাবে কোনো চেয়ার নেই বলে টেবিলের উপর ফট করে বসে পড়লো সে। হাপাচ্ছিলো বেচারা। আমি তখনো তাকে চিনতাম না। এমনকি ঐ বখাটেগুলো নাম বলে গেলেও সেই কথা মাথায় নাই আমার।তার সদ্য ফোটা পদ্মের মতো চেহারা দেখে তার প্রতি মায়া হলো ভীষণ! ইতস্ততভাবে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম তার দিকে। সে পানি খেয়ে লম্বা একটা দম নিলো। এরপর আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
-“কোন ইয়ার?”
আমি তখন চশমা ঠিক করার ভান করে মাথা নিচু করে বললাম,
-“বোটানি,ফার্স্ট ইয়ার।”
ফার্স্ট ইয়ার কথাটা শোনামাত্র তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো সে। অগ্নিদৃষ্টি হেনে বললো,
-“সিনিয়রদের দেখলে যে সালাম দিতে হয় এটা কেউ শেখায় নাই বেয়াদপ!”
আমি তখন ভয়ে তটস্থ হয়ে ছিলাম। এই বুঝি র্যাগ দিলো সে। হঠাৎ আমার চোখ পড়লো তার কাঁধের ছেড়া অংশের দিকে। অনর্গল রক্ত পড়ছে ওখান থেকে। দ্রুত ফার্স্টএইড বক্স থেকে জিনিসপত্র বের করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলাম তাকে। প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও পড়ে ধমক খেয়ে শান্ত হলো সে। খুব খারাপ ভাবে কেটেছে ঘাড়ের পাশটায়। আর কোথাও কেটেছে কিনা তা দেখার জন্য শার্ট তুলতেই খেঁকিয়ে উঠে বললো,
-“এক থাপ্পড়ে কান লাল করে দেবো বেয়াদপ। সিনিয়রের শার্ট খুলছিস তুই? বেহায়া, বেশরম! চড়িয়ে তোর সব দাঁত ফেলে দেবো। আর কোনোদিন যাতে তোকে আমার চোখের সামনে না দেখি। যদি কোনোদিন পড়িস তো বুঝে নিবি সেদিনই তোর জীবনের শেষদিন।”
গটগট করে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেলো সে। আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। তার কথাগুলো আমার কানে লাগলোনা। আমি চেয়ে রইলাম তার কোমড়ের দিকে। ভয়ংকরভাবে কেটেছে কোমড়ের ডানপাশে। ফর্সা কোমড়টা থেঁতলে গেছে ভালোভাবেই..
এর কয়েকদিন পরের কথা। ক্লাস রুমে ঢোকার আগমূহুর্তেই অনি ভাই আর তার ব্যাচমেটদের সামনে পড়ে গেলাম। এবার আর ভুল করলাম না। শুরুতেই সালাম দিলাম। তার পাশে যেই মেয়েগুলো ছিলো তারা নাক সটকালো। একজন পাশে এসে বললো,
-“তেল চপচপা চুল থেকে কি বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে!”
আমি মাথা নিচু করে রইলাম। আগেরদিনই শ্যাম্পু করেছিলাম। মা বললো,তেল দিলে মাথা ঠান্ডা থাকে। পড়াশোনায় মন বসে। ধরে বেধে এক বাটি তেল সব মাথায় মাখিয়ে দিলো।
অনি ভাইয়ের মিনিস্কার্ট পড়ুয়া সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড আমার লম্বা চুলের বেণী টেনে ধরে বললো,
-“গাইয়া ভুতটা দেখোনা স্কুলের মেয়েদের মত বেণী বেধেছে। দেখতেও কার্টুনের মতো। হাদারাম টা আমাদের ভার্সিটিতে কিভাবে আসলো!”
সবাই উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করলো। তাদের এমন ব্যবহারে আমার কান্না পেয়ে গেলো। ভর্তি পরীক্ষায় আমার মেধাক্রম ছিলো ৩য় স্থানে। ভালো স্টুডেন্ট না হলে কি কেউ এত বড় ভার্সিটিতে চান্স পায়? আমার বাবার তো কাড়িকাড়ি টাকা নেই যে তাদের মত ডোনেশন দেবে। চুপচাপ তাদের অপমান হজম করলাম। একেকজন একেকটা কথা বলে হাসছিলো,কিন্তু অনি ভাই কোনো কথা বলছিলোনা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলো সে। এর মাঝে অনি ভাই হুট করেই আমার থেকে ওড়নাটা নিয়ে তার কপালে বেধে ফেললো। আমি তখন লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম। ওড়না ছাড়া চলতে ভীষণ অস্বস্তি হতো আমার। গা হাত দিয়ে ঢেকে রইলাম। এই কাজ সে করবে এটা ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি আমি। এরপরে তার আরেক বান্ধুবী এসে আমার ঘাড়ের কাছটায় জামা উল্টিয়ে বললো,
-“বাপ্রে… ফোরটি সাইজ!”
আবারো সবাই পেটে হাত দিয়ে হাসতে শুরু করলো। এরপর থেকে পুরা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে গেলো,”মিতুর ফোরটি সাইজ!”
লজ্জায় কয়েকদিন ক্লাসে যাওয়া বন্ধ রাখলাম।
একদিন হুট করে রূম্পা বাসায় এসে জানালো রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠান হবে। আমাকে টেনে হিচড়ে ক্যাম্পাসে নিয়ে গেলো রিহার্সালের জন্য। “চোখের বালি”র খণ্ডাংশ পারফর্ম করা হবে। একক কবিতা আবৃত্তি করতে হবে আমাকে। জাবেদ ভাই আমাদের রিহার্সালের দায়িত্বে ছিলেন। একদিন ক্যান্টিনে বসে বসে আবৃত্তি প্র্যাক্টিস করছিলাম। হুট করে কোথা থেকে যেনো অনি ভাই দলবল নিয়ে হাজির হলেন। তাদের আসতে দেখে অনেক স্টুডেন্ট সরে গেলো সেখান থেকে। ক্যাম্পাসে ইকোনোমিক্স ডিপার্টমেন্টের ফাতরামির কথা সবাই জানতো বলেই এড়িয়ে চলতো তাদের। আমি চুপচাপ বইয়ে মুখ গুঁজে ছিলাম। ফট করে অনি ভাই আমার সামনাসামনি এসে বসলো। ছোঁ মেরে হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে বললো,
-“ফোরটি সাইজ আজকাল আবৃত্তি করতেছে শুনলাম!”
আবারো সবাই আমাকে নিয়ে গবেষণায় বসলো। তার নতুন গার্লফ্রেন্ড অন্তরা আমার চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে নিজে চোখে পড়লো। তারপর ঠোটটা মুরগীর মত চুচিয়ে ক্যাটরিনা পোজ দিয়ে অনি ভাইকে বললো,
-“এ্যাই অনি,তুমি চারটা হলে কিভাবে? এইটা অনি না এইটা অনি? ও মাই ঘড!”
সবাই আরেকদফা হাসলো। আমি আগের মতই চুপ থাকলাম। এদের সাথে কথা বলা মানে যেচে সাপের লেজে পা দেওয়া। এর মধ্যে অন্তরা ৫০টা শিঙাড়া অর্ডার করলো। সবগুলো বাসি পচা ছিলো। বিথী আমার দু’হাত পেছনে ওড়না দিয়ে বেধে ফেললো। অন্তরা একটার পর একটা শিঙাড়া মুখে পুড়ে দিচ্ছিলো আমার। অনি ভাই কিছু বললোনা। আবারো সেদিনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো আমার দিকে..
অসম্ভব পেটব্যাথা আর ডায়রিয়া নিয়ে এক সপ্তাহ মরার মতো বিছানায় পড়ে রইলাম। বাসায় স্যালাইন দেয়া হয়েছিলো। বাবা রোজ হুজুর থেকে ঝাড়ফুঁক করে আনা ডাবের পানি খাওয়াতেন। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিলাম। অন্তরা ইকোনোমিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরের ভাগ্নী। সুতরাং তার বিরুদ্ধে কোনো কমপ্লেন করার ক্ষমতাও আমার ছিলোনা।আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলাম বলে ঝামেলা এড়িয়ে চলতাম সবসময়। এটাও তেমনভাবে এড়িয়ে গেলাম। বাসায় বললাম জাংকফুড খেয়ে এই অবস্থা। রূম্পা আর জাবেদ ভাই দেখতে আসলো। জাবেদ ভাই আমার ডিপার্টমেন্টের এক ইয়ার সিনিয়র। আচরণে অনি ভাইয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। রূম্পা হেসে হেসে বললো,
-“আরে ক্যাম্পাসের গরম খবর জানিস তুই? অন্তরাতো দুইদিন ধরে হসপিটালে! পুরো একদিন নাকি টয়লেটেই কাটায় দিছে।”
রূম্পা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো।জাবেদ ভাই একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললো, অনুষ্ঠানের দিন এটা পড়তে। বিশেষ দিনে বিশেষ পোশাক।
প্যাকেট খুলে দেখলাম খুব সুন্দর একটা শাড়ি দিয়েছে জাবেদ ভাই। সাদা সিল্কের শাড়ির জুড়ে গোল্ডেন সুতার কাজ। আবার পুরো পাড়টায় গোল্ডেন লেইস বসানো।
রবীন্দ্র জয়ন্তির আর তিনদিন বাকি। বাবার দিক থেকে স্ট্রেইট না ছিলো। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে ভার্সিটিতে যেতে দিবেন না তিনি। জাবেদ ভাই রিকুয়েস্ট করলেন বিশেষভাবে। তার কনভিন্স করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো। বাবা রাজী হয়ে গেলেন।
প্রোগ্রামের দিন হাল্কা সাজিয়ে দিলো রূম্পা। চোখে কাজল আর ঠোঁটে লাল ম্যাট লিপস্টিক দিয়ে দিলো। গলায় হাল্কা মেটেলের গয়না আর কানে ঝুমকো পড়িয়ে দিলো। ছাড়া চুলে নিজেকে নিজে দেখেই অবাক বনে গেছিলাম! আজ হঠাৎ নিজের প্রশংসা শুনতে ইচ্ছা করছিলো ভীষণ….
প্রোগ্রাম শেষে করতালিতে মুখোরিত হয়ে গেলো পুরো ক্যাম্পাস। স্টেজ থেকে দেখতে পেলাম পুকুরপাড়ে অনি ভাই গিটার নিয়ে বসে আছে। আজ পাঞ্জাবী পড়েছে সে। আশ্চর্য!
তার সাদা পাঞ্জাবীতেও গোল্ডেন সুতার কাজ। আশে পাশে ছোটখাটো জটলা। ভীড়ের পেছনে উকি দিয়ে দেখলাম ব্যাটা গান গাইছে। সো কল্ড গার্লফ্রেন্ড অন্তরা তার কাঁধে মাথা রেখে গান শুনছে। আমার হঠাৎ তার প্রতি ঘৃণা জন্মালো। দৌড়ে মেকাপ রুমে চলে আসলাম। শাড়িতে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছি। এছাড়া সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিলো প্রায়। বাসায় যেতে হবে। শাড়ি খোলার আগে হুট করে কে যেন পেছন থেকে এক হাত চেপে ধরলো। চিৎকার করে ছুটিয়ে নিতে যাবো তখন দেখলাম অনি ভাই। চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। অনি ভাই খুব শক্ত করে হাত চেপে ধরায় কাচের চুড়িগুলো ঝুরঝুর করে ভেঙে গেলো। কিছু ভাঙা অংশ হাতে ঢুকে গেলো। অনি ভাই বললো,
-“এই শাড়ি তোকে কে দিয়েছে?”
আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। হাতটা জ্বলে যাচ্ছিলো। তার হাতের চাপে ঢুকে যাওয়া চুড়ির অংশগুলো আরো বেশি করে চেপে বসছিলো হাতে। অনি ভাই চিৎকার করে বললেন,
-“কথা কানে যায়না বেয়াদপ? এই শাড়ি তোকে কে দিছে? জাবেদ দিছে? মুখ খোল নাইলে তোকে আজকেই শেষ করে দেবো!”
আমার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছিলো। কোনোরকমে মাথা দুলিয়ে সায় দিলাম। এরপর সে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে শাড়ির কুচি টেনে বললো,
-“এই শাড়ি তোকে জাবেদ দিছে? এই পাতলা ফিনফিনে ব্লাউজ তোকে জাবেদ দিছে? আর ভেতরের অন্তর্বাসটাও জাভেদ দিছে? না? সব তোকে জাবেদ দিছে? সারা ক্যাম্পাস পেট দেখিয়ে বেড়াস? ডুবে ডুবে জল খাস? তুই জাবেদের দেওয়া অন্তর্বাস পড়িস? দেখি কি রঙ ঐটার!”
অনি ভাইয়ের কথা শুনে আমার সমস্ত শরীর জ্বলে গেলো। মনে হচ্ছে কেউ কানে গরম সীসা ঢেলে দিয়েছে। অনি ভাই গায়ে হাত দিতে নিলে শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে তাকে এক চড় দিলাম।
চড় খেয়ে কিছুক্ষণ হা করে আমার দিকে চেয়ে রইলো সে।মূহুর্তে চোখ দুটো রক্তলাল হয়ে গেলো তার। ঘর্মাক্ত কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। হুট করে পকেট থেকে ব্লেড জাতীয় কিছু বের করে আমার শাড়ির আঁচল কেটে ঝাঁঝড়া বানিয়ে দিলো। ব্লাউজের পেছনের ফিতা ছিঁড়ে ফেললো। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। অনি ভাই বললো,
-“আজকে তুই ক্যাম্পাস থেকে এই ছেঁড়া শাড়ি নিয়ে কিভাবে বের হোস আমি দেখবো! শরীর দেখাতে মন চায় না তোর? যা দেখা গিয়ে শরীর!”
অনি ভাই চলে গিয়েও আচমকা দরজার কাছ থেকে আবার ফিরে এসে ফট করে আমার ঠোঁটে চুমু খেয়ে বসলো। যেতে যেতে ফোনে বলতে লাগলো,
-“অন্তু বাবুসোনা,রাগ করেনা। আরে শোনোনা, ভার্সিটির সোনিয়া খালা আজকে সানি লিওন সেজেছিলো। ওকেই এতক্ষণ শিক্ষা দিচ্ছিলাম..তুমি ওখানেই থাকো আমি আসছি…”
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কি চায় সে? আমার সাথে কেন এমন ব্যবহার করে? কি অপরাধ করেছি আমি? জানি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনো মিলবেনা। তাই খোঁজার চেষ্টাও করিনি কখনো।
সেদিনের কথা মনে পড়লে আমার এখনো বুক চিড়ে কান্না পায়। এক্সট্রা কাপড় ছিলো বলে সেদিন বড় অপমানের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। মেকাপ রুমেই শাড়িটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। যে শাড়ির কারণে এত অপমান ঐ শাড়ি আমি রাখবো কেন? হাতের কাটা অংশগুলোতে সেলাই পড়েছে। বাসায় বলেছি রিক্সা থেকে পড়ে গেছি। বাবার বিশ্বাস হলো কিনা জানিনা! মা সন্দেহের চোখে তাকালেন। সারাটারাত কাঁদলাম! ভয়টা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না।সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।ক্যাম্পাসে আর যাবোনা। বাবাকে বললাম, “গ্রামে চলো,এই শহর আমার জন্য না!” মা রাজি হলোনা। এত বড় ভার্সিটি ছেড়ে গ্রামের পাতি কলেজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু তবুও আমি নিজের সিদ্ধান্ত অটল ছিলাম। আর ঐমুখো হইনি। বাবা সায় দিলেন। নিজে গিয়ে সমস্ত একাডেমিক কাগজপত্র নিয়ে আসলেন। যাওয়ার কয়েকদিন আগে রূম্পা আসলো। অনি ভাই নাকি বক্সিং প্র্যাক্টিস করতে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেছে। সত্যি কথা বলতে,আমার একটুও কষ্ট হয়নি। বরংচ খুশিই হয়েছিলাম। হাত ভেঙেছে বেশ হয়েছে!
এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। আমার অনার্স শেষ। গ্রামে মাস্টার্সের কোনো সুযোগ নেই। বাবা পরিচিত এক চাচাকে ধরে প্রাইমারী স্কুলে চাকরীর ব্যবস্থা করে দিলেন। ভালোই যাচ্ছিলো দিনকাল। একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি বাড়িতে নতুন মানুষের উপস্থিতি। রূম্পা বাচ্চাসমেত চলে এসেছে…
শহর ছেড়ে চলে আসার পর আমি সবার সাথে সবরকম সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলাম। এমনকি রুম্পার সাথেও যোগাযোগ রাখিনি। খুব খারাপ লাগতো তবে মানিয়ে নিয়েছিলাম। আজ এত বছর পর রূম্পা কি উদ্দেশ্যে আসলো এখানে?
রূম্পা আর জাবেদ ভাইয়ের বিয়ের কথা শুনে আমি বিস্মিত হইনি একটুও। তারা কিছু না বললেও আমি জানতাম তাদের মধ্যে প্রেম ছিলো বহু বছর ধরে। ছেলের আকিকাতে দাওয়াত দিতে এসেছে। বাবাই যে তাদের আমাদের গ্রামের ঠিকানা দিয়েছে সেটা বুঝতে আর বাকি রইলোনা আমার। যাওয়ার সময় রূম্পা একটা ডায়রী দিয়ে গেলো। সবুজ মলাটের ডায়রীর প্রথম পৃষ্ঠায় আমার সেই ভার্সিটি থাকাকালীন একটা ছবি। যার নিচে ক্যাপশন ছিলো,
“আমার মায়াবতী”
আমার কলিজা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো।
রাত হওয়ার অপেক্ষাতে সারাদিন ছটফট করলাম। কার ডায়রী এটা? কি আছে তাতে? সব জানতে হবে আমাকে! সব…
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ডায়রীটা নিয়ে বসলাম। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা ছিলো,
“মিতু,তুই কি জানিস চশমায় তোকে কত বোকা বোকা লাগে? উজবুক একটা!”
আমি হেসে ফেললাম। এভাবে কেউ উজবুক ডাকতে পারে জানা ছিলোনা আমার। আবারো পেজ উল্টালাম।
“এই মেয়ে, শরীরে তো ২০ সাইজের জামাও হবেনা মনে হয়! ৪০ সাইজের জামা পড়ে বুড়ি সেজে থাকিস কেন?”
পৃষ্ঠার পর পর পৃষ্ঠা শুধু আমাকে নিয়েই লেখা ছিলো। কখনো মায়াবতী, কখনো কেশবতী!
“মায়াবতী, তোর ঠোঁটের কোণে তিলটার উপর আমার খুব লোভ রে! হাজারখানা চুমু খেলেও স্বাধ মিটবেনা আমার!”
“তুই কি জানিস তোর দেওয়া ব্যান্ডেজের কাপড়টা আমি রেখে দিয়েছি খুব যত্ন করে! প্রথম তুই কিছু দিলি তো তাই! হেহে”..
“মিতু,একদিন তো চুল খোলা রেখে আসতে পারিস! কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ দিবি,যাতে নজর না পড়ে।”…
“তোকে কেউ কষ্ট দিলে আমি সহ্য করতে পারিনা। সেই অন্তরা তোকে কষ্ট দিলো! তাকে আমি ছেড়ে দেই কিভাবে বল! তাই একদিন সুযোগ বুঝে ওর জুসের সাথে গোলাপজল মিশিয়ে দিয়ে ওকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম..হিহি!”
“জানিস, তোকে একবার দেখার জন্য বোটানী ক্লাসে লুকিয়ে থাকতাম? কতবার স্যারের কাছে ধরা পড়েছি তুই কি দেখেছিস কখনো? একটু বুঝবিনা আমাকে?”
এবার আমার সবচে অবাক হওয়ার পালা আসলো। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তোলা আমার একক একটা ছবির নিচে ক্যাপশন ছিলো,
“সারা শহর খুঁজে তোর জন্য শাড়িটা এনেছিলাম। সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ খুঁজতে দম বেরিয়ে গেছিলো। তোর সাথে মিলিয়ে আমিও একই রঙের পাঞ্জাবী কিনলাম। আর তুই.. শাড়িটা এভাবে পুড়িয়ে ফেললি? আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনিরে। কিন্তু কিছু মানুষ তোকে এভাবে চোখ দিয়ে গিলছিলো যে সহ্য হচ্ছিলোনা আমার। তাই এভাবে কষ্ট দিয়েছিলাম তোকে। তোকে কষ্ট দেওয়ায় নিজেকে নিজে শাস্তি দিলাম। ডাম্বেল দিয়ে হাত থেঁতলে দিয়েছি। এই হাত দিয়ে কষ্ট দিয়েছিলাম তোকে এই হাত রাখার কোনো মানে হয়না!”..
আমার চোখ দিয়ে অনরবরত পানি ঝড়ে পড়ছিলো। হাজারটা আফসোস আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসছিলো ভেতর থেকে। শুধু আমার জন্য একটা মানুষ এতটা কষ্ট পেলো?
“মিতু,তোকে কতটা ভালোবাসি তা জানা নেই আমার। মা মারা যাওয়ার পর নিজেকে ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছিলাম। মেয়েদের নিয়ে খেলা করাটা আমার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু তুই এসে আমার এলোমেলো জীবনটা আরো এলোমেলো করে দিলি। সেদিনের ছোট্ট ভুলের জন্য তোকে এভাবে হারিয়ে ফেলবো কখনো ভাবিনি। মিতু? সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝিস? আমার বুকের হাহাকার তোর কাছে পৌঁছায়? আমি কেমন আছি জানিস মিতু? আমি ভালো নাই। তোকে ছাড়া ভালো থাকা সম্ভব না। যেখানে তুই নাই সেখানে আমিও নাই। সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। তোর ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়ে আমি আর বাচতে পারছিলাম না এভাবে। তাই ঠিক করলাম কানাডা চলে যাবো বাবার কাছে। ভালো থাকিস মিতু। ভালো থাকিস আমার ভালোবাসা।”..
শেষ পৃষ্ঠা পড়ে চোখের পানি বাধ মানছিলোনা আমার। ডায়রীটা বুকে চেপে সারারাত কাঁদলাম। “আমিও তোমাকে ভালোবাসি অনি ভাই! কিন্তু ভাগ্য আমাদের সাথে ছিলোনা।”..
রুম্পার ছেলের আকিকার দিন কিছু গিফট নিয়ে তাদের বাসায় গেলাম। ডায়রীটা পাওয়ার পর থেকে আমার সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে। তবু অনুষ্ঠান চলাকালীন মুখে হাসি ধরে রাখলাম। রূম্পা হয়তো বুঝতে পারলো। রাতে ছাদের চাবি দিয়ে বললো,”ছাদ থেকে ঘুরে আয়,ভালোলাগবে।”
ছাদে আসার পর সারাদিনের জমিয়ে রাখার সব কান্না বেড়িয়ে আসলো। নিঃশব্দে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিলো। হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে পেছনে ঘুরে তাকাতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠলাম। অস্ফুট স্বরে বললাম,
-“তুমি?”
অনি ভাই দাঁত কেলিয়ে হাসছিলো। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। পোশাকেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাকে দেখে কান্না পরিমাণ আরো বেড়ে গেলো আমার। তার বুকে ইচ্ছেমত কিল ঘুষি বসিয়ে দিলাম। জড়িয়ে ধরে বললাম,
-“কেন এভাবে এতোগুলো বছর আমাকে কষ্ট দিলে তুমি?”
অনি ভাই কোনো জবাব দিলোনা। নিঃশব্দে আমার সব অভিযোগ শুনছিলো। পূর্ণিমা রাত বলে পুরো আকাশটা চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে। আজ অনেক কথা হবে আমাদের… অনেক কথা…
(সমাপ্ত)

0 Comments