![]() |
| করতে চাই নি |
এই যে শুনুন আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই নি।
—-তাহলে বিয়ে করলেন কেনো?
—-বাবার মুখের দিকে চেয়ে, বাবা হার্টের রোগী তাই বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছি,আপনাকে আমি স্বামী হিসাবে কখনোই মানতে পারবো না।
—-আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নেই,আমি জোর করবো না।
—-হুম ধন্যবাদ।
—-তাহলে বিয়ে করলেন কেনো?
—-বাবার মুখের দিকে চেয়ে, বাবা হার্টের রোগী তাই বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছি,আপনাকে আমি স্বামী হিসাবে কখনোই মানতে পারবো না।
—-আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নেই,আমি জোর করবো না।
—-হুম ধন্যবাদ।
—-পরিচয় দেই, আমার নাম আকাশ আর ও আমার ছেলে আয়াজ,আর আয়াজ উনি তোমার..
….
—-আন্টি,আমায় মোটেও মা বলে ডাকবে না,আমার এতটাও খারাপ দিন আসেনি যে একটা বুড়ো লোক কে বিয়ে করে রেডিমেড বাচ্চার মা হবো।
—-তাহলে কি চান আপনি?
—-এখন আপাতত কিছুদিন এখানে থাকবো,তিনমাস পর আমায় ডিবোর্স দিবেন,আমি বাবাকে বলবো আপনি মদ খান আর আমায় প্রায় ই মারধোর করেন তাই আমি বাধ্য হয়ে চলে এসেছি, বাবাকে আমি ম্যনেজ করবো।
—-জ্বী আচ্ছা সেটাই হবে।
—-হুম গুড,আর হ্যঁ শুনুন আমি যতদিন এ বাসায় থাকবো ততদিন আমার রান্না আমি করবো,আমার কাজ আমি করবো আর আপনার ও আপনার ছেলের কাজ আপনি করবেন,আমি এই ঘরেই থাকবো আর আপনি ও আপনার ছেলে ওই ঘরে বুঝেছেন।
—-(চশমা নাকের উপর ঠেলে)জ্বী বুঝেছি।
—তাহলে খাম্বার মত দাড়িয়ে আছেন কেনো?ঘুমাতে কি দেবেন না?আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমাবো এখন,সারাদিন অনেক ধকল গেছে।আর হ্যঁ ঘুমের মধ্যে ডাকাডাকি করবেন না বলে দিচ্ছি।
—-যাচ্ছি, আয়াজ আয় বাবা।
—-গুড নাইট।
বলে ঠাশ করে দরজা লাগিয়ে দেয় রিয়া।
আকাশ ও তার পাচঁ বছরের ছেলে আয়াজ পাশের রুমে চলে আসে।আয়াজের জেদ ও অফিসের সিনিয়র অফিসার রায়হান সাহেবের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তার মেয়ে রিয়া কে বিয়ে করেছে আকাশ।আয়াজের জন্মের ছয় মাসের মাথায় সামিয়া মারা যায়,এতটুকু ছেলেকে ছোট থেকে ও নিজেই মানুষ করেছে,, বিয়ে করার কথা ভাবে নি,কারন যদি সৎ মা আয়াজকে কষ্ট দেয়??ঠিকমতো যত্ন না নেয়?তাই ও বিয়ে করতে চায় নি,,,আর সামিয়াকে ও এখনো ভুলতে পারে নি।কিন্তু কিছুদিন ধরে আয়াজ মা মা করে জেদ করছিলো আর রায়হান সাহেবও বারবার অনুরোধ করছিলো তাই বিয়েটা করতেই হলো আকাশের।কিন্তু মেয়েটা যে এমন করবে সেটা ও ভাবতেও পারে নি,অন্তত ওর ছেলেটাকে তো কাছে রাখতে পারতো কিন্তু সেটাও করলো না।এতটুকু বাচ্চা ছেলেটার মনে কষ্ট দিলো?কিন্তু পরে আকাশ ভাবলো যে মেয়েটার কি ই বা দোষ,কোন মেয়ে ই বা চায় রেডিমেড বাচ্চার মা হতে আর ত্রিশ বছরের কোন বিবাহিত লোককে বিয়ে করতে?তাই রিয়ার দোষ দিতে পারলো না আকাশ,নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে বিছানায় গেলো,ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…..
—-কিরে রাগ করেছিস নতুন মায়ের কথা শুনে?
—-না বাবা,রাগ করবো কেনো?নতুন মায়ের কথাগুলি খুব ভালো লেগেছে আর নতুন মাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।
—-কিরে মনে হচ্ছে নতুন মায়ের ভক্ত হয়ে গেছিস
—-হুম ঠিক তাই,কেন বাবা তোমার পছন্দ হয় নি নতুন মা কে?
—-যেভাবে শাসালো পুরো হিটলারনী,একেবারে ঝাল লঙ্কা!!!পছন্দ হলেই বা কি।
—-বাবা মার সামনে এটা বললে কিন্তু মা তোমায় আস্ত চিবিয়ে খাবে।
—-সামনে বলে নিজের দুর্ভাগ্যকে ডাকতে চাই না,বাব্বাহ!!!মেয়ে তো না একেবারে হিটলারনী।
—-বাবা যা ই বলো নতুন মা কে আমার ভালো লেগেছে।
—-তোকে তো মা বলতে নিষেধ করেছে তারপরও কেনো বলছিস বাবা।
—-সামনে তো আর বলবো না।
—-বাবা এত মায়া বাড়াস নে,পড়ে কষ্ট পাবি ও চলে গেলে।
—-না বাবা নতুন মা যাবে না,তুমি দেখে নিও।
—-কিভাবে বুঝলি?
—-তা জানি না,মা যাবে না,কখনোই না।
—-আচ্ছা দেখা যাবে এখন ঘুমা।
বলে আকাশ আয়াজ ঘুমাতে গেলো,এর আগে কিছুক্ষণ গল্প করে তাদের ঘরে আসা নতুন সদস্য রিয়া কে নিয়ে,,,পাশের ঘরে থাকা রিয়া জানতে পারলো না তার জন্য দুটি হৃদয়ের ছোট্ট কুঠুরিতে পাহাড় সমান ভালোবাসা আর মমতা জমা হচ্ছে তার জন্য।
.
পরদিন সকালে শুরু হলো তাদের তিনজনের অদ্ভুদ সংসার।সকালে ঘুম থেকে ওঠে রিয়া দেখলো আকাশ ও আয়াজ যে যার মতো চলে গিয়েছে।তাকে কেন ডাক দেয় নি?পরে মনে পড়লো সে নিজেই তো ডাকতে নিষেধ করেছিলো তাই হয়তো ডাকে নি।রিয়া ওঠে ফ্রেশ হয়ে তার জন্য নাস্তা বানালো, নাস্তা খেয়ে নিজের ঘর গুছিয়ে রান্না করতে গেলো নিজের জন্য।দুপুরে গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে একটু ঘুমালো।
বিকালে রিয়ার ঘুম ভাঙ্গে ফোনের রিংটোনের আওয়াজে,, ফোন ধরে বিরক্তিকর কন্ঠে সে বলে…
—-হ্যলো কে?
—-আন্টি আমি আয়াজ।
—-হ্যঁ বলো কেনো ফোন দিয়েছো?
—-আন্টি তুমি দুপুরে খেয়েছো?
—-হ্যঁ,তুমি খেয়েছ?আর কখন বাসায় আসবে?
—-জ্বী আন্টি খেয়েছি, আমি আর বাবা একসাথেই আসবো,আমি তো ছোট মানুষ তাই একা আসতে পারি না তাই বাবার সাথেই আসবো।বাবা ই সবসময় আমায় দিয়ে আসে আর নিয়ে আসে।তুমি ভয় পেয়ো না আন্টি।
—-ভয় পাবো কেনো?আমি কি ছোট নাকি?
—-এমনি ই বললাম আন্টি,আচ্ছা রাখি আন্টি বাই।
—-ওকে বাই।
.
বিকালে অফিস শেষে বাবা ছেলে একসাথে বাসায় ফিরে আসে।বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আকাশ তার ও ছেলের জন্য রান্না করতে লাগলো।সামিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে ও নিজেই রান্না করে খায়,বুয়া রাখে নি।তাই অভ্যাস আছে।
নিজেদের রান্না শেষ করে কফি বানিয়ে টিভির ঘরে গিয়ে টিভি দেখতে লাগলো।রিয়াকে একটুও বিরক্ত করে নি দুজনে।কিছুক্ষণ পর আয়াজ গিয়ে রিয়ার ঘরের দরজায় টোকা দেয়।
—আন্টি ঘরে আছো?
—-কে?
—-আন্টি আমি আয়াজ।
—-ও তুমি, এসো।
আয়াজ ঘরে ঢুকে রিয়ার দিকে কফির মগটা এগিয়ে দেয় আর বলে…
—-বাবা এটা তোমায় দিতে বললো,তাই এলাম।
—-আচ্ছা রেখে যাও,আমি খেয়ে নেবো।
—-ওকে আন্টি।
বলে আয়াজ চলে যায়।রিয়া কফিতে চুমুক দেয় আর বাবা ছেলের কথা ভাবে।ছেলে একদম বাপের জেরক্স কপি,চুপচাপ, চশমা পড়ে।সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে, কে বলবে এই ছেলের মা নেই।হঠাৎ আয়াজের জন্য বুকে এক অজানা মায়া অনুভব করে রিয়া।
.
রাতে খাওয়া-দাওয়া করে রিয়া ও আকাশ নিজেদের ঘরে ঘুমাতে যায়,,ঘুমানোর আগে আকাশ ও আয়াজের ঘর থেকে হাসির আওয়াজ আসছে দেখে কৌতুহলবশত: আকাশের ঘরে উকি দেয়,, দেখে আকাশ আয়াজকে কোলে নিয়ে গল্প করছে ও সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর আয়াজ হেসে গড়িয়ে পড়ছে।বাবা ছেলের এমন হাসি দেখে রিয়ার ঠোটেঁও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
.
এভাবেই চলছিলো তাদের জীবন।আকাশ ও আয়াজ ভুলেও রিয়াকে বিরক্ত করতো না,নিজেদের মত থাকতো,নিজেদের কাজ নিজেরাই করতো,বাবা ও ছেলে কিভাবে এতটা গুছানো স্বভাবের হতে পারে এটা ভেবে রিয়া প্রায় ই অবাক হয়।রাতে মাঝে মাঝে আকাশের ঘরের দরজায় কান পেতে বাবা ছেলের গুটুর গাটুর কথা আর প্রানখোলা হাসি শোনে রিয়া,,,তখন ওরও মন চায় ওদের সাথে যোগ দিতে কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা পায় রিয়া,সেটা ও নিজেও বুঝতে পারে না।
একদিন রাতে রিয়াকে খাবার টেবিলে না দেখে আকাশ আয়াজকে বলে তার নতুন মা কে ডেকে আনতে(কারন তারা নিজেদের রান্না আলাদা করে করলেও খাবার টেবিলে একসাথেই খেতো)।আয়াজ গিয়ে তার নতুন মা কে ডাক দেয় কিন্তু রিয়া উত্তর না দিয়ে বিরবির করে কি যেন বলতে থাকে।আয়াজ সেটা বুঝতে না পেরে রিয়ার হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করে চমকে যায় কারন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে রিয়ার,সাথে সাথে আয়াজ ওর বাবাকে ডাকে,আকাশ ছেলের ডাক শুনে রিয়ার রুমে যায় ও গিয়ে আয়াজকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে?আয়াজ তার বাবাকে বলে নতুন মায়ের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।আকাশ রিয়ার হাত ধরবে কি না দ্বিধায় পড়ে যায় কারন রিয়া তাকে স্বামীর অধিকার দেয় নি,অনেক ভেবে রিয়া অসুস্থ বলে বাধ্য হয়ে ওর হাত ধরে ও ভাবে পড়ে এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে।ওর হাত ধরে দেখে সত্যি মেয়েটার গায়ে অনেক জ্বর।সাথে সাথে আকাশ বালতি দিয়ে পানি নিয়ে এসে রিয়ার মাথায় ঢালতে থাকে ও আয়াজ ভেজা কাপড় দিয়ে রিয়ার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে।প্রায় অনেকক্ষণ এভাবে পানি ঢালা ও জলপট্টি দেয়ার পর রিয়ার জ্বর একটু কমে আসে।আকাশ বারবার আয়াজকে ঘুমাতে যেতে বললেও আয়াজ যায় নি,সে তার নতুন মায়ের এই অবস্থায় তাকে একা রেখে যাবে না বলে গোঁ ধরে রিয়ার পাশেই বসে থাকে,আকাশও আর কিছু বললো না আয়াজকে।
.
এভাবে রাত কেটে যায়,ভোর হলে রিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়,চোখে মেলে দেখে আকাশ চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে ও আয়াজ তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে,,,নিচে পানির বালতি ও ভেজা কাপড় দেখে বুঝতে পারলো কাল তার কি হয়েছিলো।সারারাত বাবা ও ছেলে তার সেবা করেছে এটা ভাবতেই ওর মনটা কেমন যেন করে ওঠলো?যে মানুষটাকে ও স্বামী বলে মানে নি,ছুতেওঁ দেয় না সে মানুষটা সারারাত ধরে তার মাথায় পানি দিয়েছে?তার সেবা করছে?যে নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে রিয়া রেডিমেড বাচ্চা বলে মা বলে ডাকতে দেয় নি,দুরে সরিয়ে রেখেছে সে বাচ্চাটাও তার জন্য রাত জেগেছে?এতটুকু বাচ্চার মনে তার জন্য এতোটা ভালোবাসা দেখে রিয়ার চোখ ভিজে যায়,মনের অজান্তে আয়াজের কপালে ছোট্ট একটা চুমু একেঁ দেয় রিয়া।
এরপর রিয়া আকাশকে ডাক দেয়,ওর ডাক শুনে আকাশ ধড়মড় করে জেগে ওঠে ও চশমা ঠিক করে মাথা নীচু করে জিজ্ঞেস করে…..
—-এখন কেমন বোধ করছেন?
—-জ্বী এখন ভালো।
—-আচ্ছা এখন বিশ্রাম নিন,আমি নাস্তা তৈরি করে আনছি আর ঔষধ এনে দিচ্ছি।
—-জ্বী আচ্ছা।
—-আর শুনুন আজ আপনাকে রান্না করতে হবে না,আমি ই রান্না করবো দুপুরে এসে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসবো।আপনি রেষ্ট নিন।
—-আচ্ছা।
এটা বলে আকাশ আয়াজকে ডেকে তোলে ও নাস্তা রেডি করে রিয়ার ঘরে পাঠিয়ে দেয় ও আয়াজকে স্কুলে না পাঠিয়ে রিয়ার কাছে রেখে যায় যেন কিছু হলে সাথে সাথে আকাশকে জানাতে পারে।সবকিছু ঠিক করে আকাশ অফিসে চলে যায়।
.
আকাশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আয়াজ গুটিগুটি পায়ে গিয়ে রিয়ার ঘরের দরজায় টোকা দেয়…
—-আন্টি ভিতরে আসতে পারি?
—-হ্যঁ এসো।
—-এখন কেমন আছো আন্টি?সরি তুমি করে বলে ফেললাম।
—-না ঠিক আছে তুমি করেই বলো,এখন মোটামুটি সুস্থ।
—-তাহলে এখন নাস্তা করে নাও আন্টি,খেয়ে ঔষধ খেয়ে নাও,আমি পরে আসছি।
—-না না তোমার যেতে হবে না,তুমি বসো সমস্যা নেই।
—-ওকে আন্টি।
—-তুমি নাস্তা করেছো?
—-জ্বী আন্টি বাবার সাথে করেছি।
—-গুড বয়।
—-আচ্ছা আন্টি একটা কথা বলি?
—-হ্যঁ বলো।
—-জানো আন্টি আমি মা কে কখনো দেখিনি,মায়ের আদর কেমন হয় তা আমি জানি না,স্কুলে যখন সব বাচ্চার মা তাদের ছেলে মেয়েকে নিয়ে যায় তখন আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে,মা আজ বেচেঁ থাকলে আমায়ও ঠিক এভাবে স্কুলে নিয়ে যেত।খুব খারাপ লাগে আমার,কিন্তু বাবা কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেয় নি,আমার কাছে বাবা ই আমার মা,কিন্তু তারপরও মায়ের জন্য একটা শূন্যতা ও টান অনুভব করি।আজ মা থাকলে আমিও ওদের মত আদর পেতাম,মা বলে ডাকতে পারতাম কিন্তু সেটা হয়তো আর হবে না আন্টি……..
ছোট্ট বাচ্চার মুখে এসব শুনে রিয়ার মনটা কেদেঁ ওঠে,এতটুকু একটা ছেলে এতকিছু বুঝে,কত গুছিয়ে কথা বলে।ছেলেটা মায়ের জন্য কতটা ব্যকুল তা অনুভব করে রিয়া,এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে সে কিভাবে কষ্ট দিলো এটা ভাবতেই ওর কান্না আসছে,,, কোনমতে নিজেকে সামলে বললো…..
—-মন খারাপ করো না,আমি তো আছি।
—তুমি তো আন্টি,আমার না নও।
—-আন্টি তাতে কি, আমায় মায়ের মত ভালোবাসতে পারবে না?
—হুম আন্টি পারবো।
—এই তো গুড বয়।
বলে আয়াজকে কাছে টেনে নেয় ও নিজের হাতে নাস্তা খাইয়ে দেয়,খাওয়ানোর সময় দেখে আয়াজের চোখ থেকে পানি পড়ছে,তা দেখে রিয়া বলে…..
—-কি আয়াজ কাঁদছো কেনো?
—-আন্টি আমায় কখনো এভাবে কেউ খাইয়ে দেয় নি,আদর করে কাছে টেনে নেয় নি,তুমি এমন করে খাওয়াচ্ছো আর আদর করছো তাই মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো,মা থাকলে আমায় ঠিক এভাবেই আদর করে খাইয়ে দিত আর আদর করতো,,বলে চোখের পানি মোছে আয়াজ।
আয়াজের কথা রিয়ার মনটা মমতায় ভরে যায়,এইটুকু বাচ্চা ছেলে কিভাবে মা ছাড়া বড় হলো,কিভাবে থাকে মা কে ছাড়া…ওর মনে তখন মমতা জাগ্রত হয় আয়াজের জন্য,আয়াজকে কাছে টেনে আদর করে তার কপালে চুমু দেয় আর বলে আমি তো আছি,কান্না করো না।
.
আকাশ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকালেই চলে আসে,এসে ফ্রেশ হয়ে রান্না বসায়।রান্না শেষ হলে আয়াজকে দিয়ে রিয়াকে খেতে ডাক দেয় আকাশ,রিয়া এলে আকাশ তার শারীরিক অবস্থা জিজ্ঞেস করে আর এখন কেমন বোধ করছে সেটা জানতে চায়।রিয়া বলে সে এখন সুস্থ আছে আর ভালো বোধ করছে।
খাওয়া শেষ হলে রিয়া ঔষধ খেয়ে বিশ্রাম নেয় ও কিছুক্ষণ ঘুমায়,সন্ধ্যায় ওর ঘুম ভাঙ্গে।রিয়ার ঘুম ভাঙলে আজও আয়াজ এসে তাকে কফি দিয়ে যায় ও এখন কেমন আছে সেটা জানতে চায়,রিয়া বলল সে এখন পুরোপুরি সুস্থ।
রাতে খাওয়ার পর যথারীতি আকাশ ও আয়াজ তাদের রুমে চলে যায়,কিছুক্ষণ পর রিয়া চুপিচুপি তাদের রুমে যায় ও দরজায় কান পেতে ওদের কথোপকথন শোনে।কথাগুলি শুনে আকাশ ও আয়াজের জন্য ওর মায়া হয়,নিজের ঘরে এসে অনেক কিছু চিন্তা ভাবনা করে রিয়া ,,,,আকাশকে স্বামীত্ব ফলাতে না বলায় আকাশও ওকে জোড় করে নি,বিরক্ত করে নি,যা যা বলেছে সেটাই করেছে, ছোট্ট বাচ্চাটাও ওর কথা শুনেছে।
সবকিছু আলাদা করেছে,নিজেদের গুছিয়ে রেখেছে,ওর সেবাও করেছে।ওদের এই ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ রিয়ার মনকে নরম করে দেয়,মনে মায়া ও মমতার জন্ম দেয়,রিয়া ঠিক করে সে যতদিন এখানে আছে ততদিন ঘরের সব কাজ ও নিজে করবে,আয়াজকে নিজে স্কুলে দিয়ে আসবে,রান্না ও নিজে করবে।
.
এসব ভেবেও কেন জানি এগুলো করতে পারছিলো না রিয়া,,,এরপরের বেশ কয়েকদিনও একই ঘটনার
পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলো।রিয়ার কথামত
আকাশ আর আয়াজ দুজনের কেউই ওকে কোনরকম
বিরক্ত করতো না, দুজনের এই নির্লিপ্ততা
রিয়াকে প্রথমে স্বস্তি এনে দিলেও আজ সেটা
ওর রাগের কারন হয়ে ওঠলো,,সারাদিন নিজের জন্য রান্না করা বাদে দুহাত
গুটিয়ে অথর্বর মত বসে থাকা ছাড়া ওর
কোন কাজ নেই। ওর মেজাজ বেশি
বিগড়াতো তখন, যখন বাপ আর ছেলের গুটুর
গুটুর গল্প আর পেট ফাটানো হাসির শব্দ শুনে রিয়া কৌতুহলী হয়ে সামনে দাড়াতেই
দুজনই চুপ মেরে যেত। এমন ভাব ধরত যেন পেটে
বোমা মারলেও মুখ দিয়ে কিছু বেরুবে
না। কিন্তু রিয়া আড়াল হওয়ামাত্র আবারও
হা হা হি হি হো হো শুরু হতো।
.
এসব দেখে রাগে পরেরদিন সকালে নাস্তার টেবিলের সামনে দাড়িয়ে রিয়া রাগী গলায় ঘোষনা
করলো,,,,,,
‘‘আমি যতদিন এ বাড়িতে আছি
কাল থেকে ততদিন পর্যন্ত সকালের
নাস্তা থেকে শুরু করে ঘর গোছানো, রান্না করা,কাপড় ধোয়া আমি
করবো,,, আয়াজকে স্কুল থেকে নিয়ে আসবো,,,
আমি টিভি দেখি আর নাই দেখি টিভির
রিমোট আমার হাতে থাকবে আর তোমাদের
দুজনের যত গাটুর গুটুর আলাপ আছে তা শুনি
আর নাই শুনি আমার সামনেই হতে হবে।
আর আয়াজ আজ থেকে তুমি আমার সাথে
ঘুমুবে।’’
একথা শোনার আধ ঘণ্টার মাঝেই আয়াজ পার্টি বদল করে বাবার ঘর থেকে ওর
ব্যাগ পোটলা গুছিয়ে লাফাতে লাফাতে
রিয়ার ঘরে চলে গেলো।
.
তিনমাস পূর্তির দিনগুলো এরপর যেন দ্রুতই
কাটতে লাগলো। বাবা ছেলের
নির্লিপ্ততা ও বোবা অভিনয়ের আড়ালে
জমিয়ে রাখা ভালবাসাগুলো রিয়াও টের
পাচ্ছিলো অনেক দ্রুততায়। এই দুটো
মানুষের যত গল্প হাসি চিন্তা স্বপ্ন সবই যে রিয়াকে
ঘিরে তা জানার জন্য মাঝে মাঝেই
দরজায় কান পেতে থাকতে হতো,আয়াজ
আকাশের সাথে কথা বলার সময় রিয়াকে যে
গভীর
মমতা ও মায়া নিয়ে মা বলে ডাকে তা শুনে রিয়ার মনেও মমতা জাগ্রত হয়,দিনে একবার শাড়ির আচলঁ কোমড়ে পেচিয়েঁ আকাশের সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া না করলে
রিয়ার দিন টা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। টিভিতে
খেলা দেখার সময় সবসময়ের বাবার
পক্ষের দলকে সাপোর্ট করা আয়াজ যখন
নানান অজুহাতে রিয়ার পক্ষে বাবার সাথে তর্ক করে রিয়া
তখন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আয়াজকে।
এইটুকুন বাচ্চা রোজ রাতে যখন ঘুমের ভান
করে অপেক্ষায় থাকে রিয়া ঘুমিয়ে পড়ার
পর তার গায়ে আলতো করে হাত রাখবে,
এটা দেখে রিয়ার চোখে তখন ভালবাসার মেঘেরা
ভীড় করে।
প্রতিদিন আয়াজকে স্কুল থেকে আনতে
গিয়ে অপেক্ষায় থাকা রিয়া যখন সকলের মুখে
আয়াজের বলা কথা ‘‘আমার মা ই পৃথিবীর সেরা
মা’’ শুনে আক্ষেপ করে নিজের উপর। এই
ছোট্ট বাচ্চার হৃদয়ে রিয়ার জন্য এত ভালবাসা কিভাবে
ও সাথে নিয়ে চলে যাবে তাই
ভেবে ওর মনটা হাহাকার করে ওঠে,কান্নায় বুকটা ফেটে যায়।
.
অবশেষে তিনজন মানুষের আবেগের
অভিনয় করার দিন ফুরিয়ে আসলো।
আকাশ পরদিনের বাসের টিকিট কেটে এনে
রিয়ার হাতে দিল। সেদিন বর্ষার দিন ছিল।
সারারাত মুষলধারে বৃষ্টি হলো,,,, প্রবল বর্ষনের
সাথে আয়াজ আর আকাশের চোখের জলও মিলে
মিশে একাকার হল সে রাতে।
.
চলে যাওয়ার মুহূর্তটা যতটা অস্বস্তিকর
হবে বলে রিয়া ভেবেছিল তেমন কিছুই হল
না। শুধু বাসে উঠতে গিয়ে টান লাগায় চমকে ফিরে
তাকিয়ে দেখল আয়াজ ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ ছলছল করে এক
হাতে ওর শাড়ির আঁচল খামচি দিয়ে ধরে
আছে। আকাশ মৃদু হেসে বলল, ‘‘আন্টির
দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা,,ওর কথায়
হাতের মুঠি থেকে শাড়ির আঁচলের
কোনাটা ছেড়ে দিল আয়াজ। বাসে ওঠে রিয়ার বাসটা চোখের আড়াল হতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলো আয়াজ,আজ যে তার মা আবারো তাকে ছেড়ে চলে গেলো,,, আকাশও ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো কেননা সেও এতদিনে রিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিলো,,কিন্তু সেও আজ সামিয়ার মত একা করে চলে গেলো মায়া লাগিয়ে দিয়ে..অঝোরে কাঁদছে বাবা আর ছেলে।
.
রিয়াকে বাসে
তুলে দিয়ে কিছুক্ষণ কেদেঁ চোখের পানি মুছে আকাশ আয়াজকে নিয়ে পার্কে
গেলো,ভালো আইসক্রিম খাওয়ালো,নানা জায়গায় ঘুরলো,,, আজ অফিস ছুটি নিয়েছে আকাশ ,,,আয়াজকে
সাথে নিয়ে সারাদিন ঘুরবে বলে ,,এতে তার মনটা একটু হলেও ভালো থাকবে হয়তো।
.
সারাদিন বাইরে ঘুরে বিকেলে বাসায় ফিরতেই আকাশ ও আয়াজের চোখ
কপালে উঠলো,,ফ্ল্যাটের দরজার সামনের সিঁড়িতে
ব্যগ রেখে রিয়া বসে আছে,,ওদের দেখে চোখ মুছতে
মুছতে উঠে দাঁড়ালো ও,,শাড়ির আচলঁ কোমড়ে পেচিয়েঁ ধমকের সুরে বলল,
‘‘বাড়ি থেকে আপদ বিদায় করে দিয়েই বাপ বেটা
মিলে
সারাদিন মজা করে বেরুলে তাই
না? আকাশের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,, এই যে গাধা ফোন বন্ধ কেন তোমার”? কতশতবার নাম্বার
ডায়াল করেছি?’’সেটা কি দেখেছো একবারো???
হতভম্ব আকাশ পকেট থেকে মোবাইল বের
করে দেখলো সেটা বন্ধ হয়ে আছে।
আকাশ কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘‘কিভাবে যেন বন্ধ
হয়ে গেছে বুঝতে পারি নি,মনে হয় চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিলো,,কি ব্যাপার তুমি ফিরে
এলে কেনো?? কিছু কি ফেলে গিয়েছো?’’
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘‘গাধা
কোথাকার,,,আমি কি বলেছিলাম
আমাকে টিকিট কেটে এনে দাও? কেনো যাওয়ার
সময়
আটকালে না আমাকে? তোমার কি অধিকার ছিলো না??একবার থেকে
যেতে বললে কি আমি খেয়ে ফেলতাম
তোমাদের?’’
এটা শুনেই ছোট্ট আয়াজ কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে রিয়াকে জড়িয়ে
ধরে বলল, ‘‘মা আমাকে রেখে আর কখনো যাবে
না তো?’’
রিয়াও ওকে আরও শক্ত করে ধরে বলল, ‘‘আমার
বাবাটাকে ছেড়ে আমি আর কখখনও
কোথথাও যাবো না,কোনদিনও যাবো না ,,, তোমার মা তোমায় একা রেখে কোথথাও যাবে না,,, অনেক হয়েছে, আর
কাঁদবে না বাবা।’’
রিয়ার কথাগুলি শুনে আকাশ চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাওয়া
চশমাটা খুলে মুছতে শুরু করলো।এটা দেখে রিয়া ধমক দিয়ে বলল,
‘‘এই যে গাধা, খালি হাতে ভেজা
চশমা মুছলে হবে? এদিকে আসো।’’আকাশ
এগিয়ে যেতেই ওর হাত থেকে চশমা
নিয়ে রিয়া ওর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতে
মুছতে বলল, ‘‘আমার বাস ছেড়ে যাওয়ার
সাথে সাথে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অমন
বাচ্চাদের মত ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলে
কেনো? ছেলের কান্না দেখে? নাকি এই
হিটলারনীর জন্য? বাসের
জানালা দিয়ে মাথা বের করে এই দৃশ্য
দেখে কি কোন মেয়ের চলে যাওয়ার
ক্ষমতা থাকে?’’
‘‘এতই যখন সব বুঝতে তাহলে চলে যাচ্ছিলে কেনো?’’
‘‘তুমি যেতে দিলে কেনো গাধা,আটকাতে পারলা না?’’
আয়াজও এক হাতে ওর মাকে ধরে অন্য হাতে চশমা
খুলে রিয়াকে বলল, ‘‘মা আমারটাও মুছে
দাও।’’
ওর কথা শুনে আকাশ আর রিয়া হেসে
ফেললো।এদের ছেড়ে আর কখনো কোথাও যাবে না বলে স্থির করে রিয়া,,,কোথায় যাবে সে?? কারন এটা যে তার মায়ার সংসার…………..
সুখে থাকুক আকাশ,রিয়া ও আয়াজের মায়ার সংসার,কানায় কানায় ভালোবাসা দিয়ে ভরে থাকুক ওদের জীবন………
লিখাঃঅভিমানী নিশাদ
….
—-আন্টি,আমায় মোটেও মা বলে ডাকবে না,আমার এতটাও খারাপ দিন আসেনি যে একটা বুড়ো লোক কে বিয়ে করে রেডিমেড বাচ্চার মা হবো।
—-তাহলে কি চান আপনি?
—-এখন আপাতত কিছুদিন এখানে থাকবো,তিনমাস পর আমায় ডিবোর্স দিবেন,আমি বাবাকে বলবো আপনি মদ খান আর আমায় প্রায় ই মারধোর করেন তাই আমি বাধ্য হয়ে চলে এসেছি, বাবাকে আমি ম্যনেজ করবো।
—-জ্বী আচ্ছা সেটাই হবে।
—-হুম গুড,আর হ্যঁ শুনুন আমি যতদিন এ বাসায় থাকবো ততদিন আমার রান্না আমি করবো,আমার কাজ আমি করবো আর আপনার ও আপনার ছেলের কাজ আপনি করবেন,আমি এই ঘরেই থাকবো আর আপনি ও আপনার ছেলে ওই ঘরে বুঝেছেন।
—-(চশমা নাকের উপর ঠেলে)জ্বী বুঝেছি।
—তাহলে খাম্বার মত দাড়িয়ে আছেন কেনো?ঘুমাতে কি দেবেন না?আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমাবো এখন,সারাদিন অনেক ধকল গেছে।আর হ্যঁ ঘুমের মধ্যে ডাকাডাকি করবেন না বলে দিচ্ছি।
—-যাচ্ছি, আয়াজ আয় বাবা।
—-গুড নাইট।
বলে ঠাশ করে দরজা লাগিয়ে দেয় রিয়া।
আকাশ ও তার পাচঁ বছরের ছেলে আয়াজ পাশের রুমে চলে আসে।আয়াজের জেদ ও অফিসের সিনিয়র অফিসার রায়হান সাহেবের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তার মেয়ে রিয়া কে বিয়ে করেছে আকাশ।আয়াজের জন্মের ছয় মাসের মাথায় সামিয়া মারা যায়,এতটুকু ছেলেকে ছোট থেকে ও নিজেই মানুষ করেছে,, বিয়ে করার কথা ভাবে নি,কারন যদি সৎ মা আয়াজকে কষ্ট দেয়??ঠিকমতো যত্ন না নেয়?তাই ও বিয়ে করতে চায় নি,,,আর সামিয়াকে ও এখনো ভুলতে পারে নি।কিন্তু কিছুদিন ধরে আয়াজ মা মা করে জেদ করছিলো আর রায়হান সাহেবও বারবার অনুরোধ করছিলো তাই বিয়েটা করতেই হলো আকাশের।কিন্তু মেয়েটা যে এমন করবে সেটা ও ভাবতেও পারে নি,অন্তত ওর ছেলেটাকে তো কাছে রাখতে পারতো কিন্তু সেটাও করলো না।এতটুকু বাচ্চা ছেলেটার মনে কষ্ট দিলো?কিন্তু পরে আকাশ ভাবলো যে মেয়েটার কি ই বা দোষ,কোন মেয়ে ই বা চায় রেডিমেড বাচ্চার মা হতে আর ত্রিশ বছরের কোন বিবাহিত লোককে বিয়ে করতে?তাই রিয়ার দোষ দিতে পারলো না আকাশ,নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে বিছানায় গেলো,ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…..
—-কিরে রাগ করেছিস নতুন মায়ের কথা শুনে?
—-না বাবা,রাগ করবো কেনো?নতুন মায়ের কথাগুলি খুব ভালো লেগেছে আর নতুন মাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।
—-কিরে মনে হচ্ছে নতুন মায়ের ভক্ত হয়ে গেছিস
—-হুম ঠিক তাই,কেন বাবা তোমার পছন্দ হয় নি নতুন মা কে?
—-যেভাবে শাসালো পুরো হিটলারনী,একেবারে ঝাল লঙ্কা!!!পছন্দ হলেই বা কি।
—-বাবা মার সামনে এটা বললে কিন্তু মা তোমায় আস্ত চিবিয়ে খাবে।
—-সামনে বলে নিজের দুর্ভাগ্যকে ডাকতে চাই না,বাব্বাহ!!!মেয়ে তো না একেবারে হিটলারনী।
—-বাবা যা ই বলো নতুন মা কে আমার ভালো লেগেছে।
—-তোকে তো মা বলতে নিষেধ করেছে তারপরও কেনো বলছিস বাবা।
—-সামনে তো আর বলবো না।
—-বাবা এত মায়া বাড়াস নে,পড়ে কষ্ট পাবি ও চলে গেলে।
—-না বাবা নতুন মা যাবে না,তুমি দেখে নিও।
—-কিভাবে বুঝলি?
—-তা জানি না,মা যাবে না,কখনোই না।
—-আচ্ছা দেখা যাবে এখন ঘুমা।
বলে আকাশ আয়াজ ঘুমাতে গেলো,এর আগে কিছুক্ষণ গল্প করে তাদের ঘরে আসা নতুন সদস্য রিয়া কে নিয়ে,,,পাশের ঘরে থাকা রিয়া জানতে পারলো না তার জন্য দুটি হৃদয়ের ছোট্ট কুঠুরিতে পাহাড় সমান ভালোবাসা আর মমতা জমা হচ্ছে তার জন্য।
.
পরদিন সকালে শুরু হলো তাদের তিনজনের অদ্ভুদ সংসার।সকালে ঘুম থেকে ওঠে রিয়া দেখলো আকাশ ও আয়াজ যে যার মতো চলে গিয়েছে।তাকে কেন ডাক দেয় নি?পরে মনে পড়লো সে নিজেই তো ডাকতে নিষেধ করেছিলো তাই হয়তো ডাকে নি।রিয়া ওঠে ফ্রেশ হয়ে তার জন্য নাস্তা বানালো, নাস্তা খেয়ে নিজের ঘর গুছিয়ে রান্না করতে গেলো নিজের জন্য।দুপুরে গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে একটু ঘুমালো।
বিকালে রিয়ার ঘুম ভাঙ্গে ফোনের রিংটোনের আওয়াজে,, ফোন ধরে বিরক্তিকর কন্ঠে সে বলে…
—-হ্যলো কে?
—-আন্টি আমি আয়াজ।
—-হ্যঁ বলো কেনো ফোন দিয়েছো?
—-আন্টি তুমি দুপুরে খেয়েছো?
—-হ্যঁ,তুমি খেয়েছ?আর কখন বাসায় আসবে?
—-জ্বী আন্টি খেয়েছি, আমি আর বাবা একসাথেই আসবো,আমি তো ছোট মানুষ তাই একা আসতে পারি না তাই বাবার সাথেই আসবো।বাবা ই সবসময় আমায় দিয়ে আসে আর নিয়ে আসে।তুমি ভয় পেয়ো না আন্টি।
—-ভয় পাবো কেনো?আমি কি ছোট নাকি?
—-এমনি ই বললাম আন্টি,আচ্ছা রাখি আন্টি বাই।
—-ওকে বাই।
.
বিকালে অফিস শেষে বাবা ছেলে একসাথে বাসায় ফিরে আসে।বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আকাশ তার ও ছেলের জন্য রান্না করতে লাগলো।সামিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে ও নিজেই রান্না করে খায়,বুয়া রাখে নি।তাই অভ্যাস আছে।
নিজেদের রান্না শেষ করে কফি বানিয়ে টিভির ঘরে গিয়ে টিভি দেখতে লাগলো।রিয়াকে একটুও বিরক্ত করে নি দুজনে।কিছুক্ষণ পর আয়াজ গিয়ে রিয়ার ঘরের দরজায় টোকা দেয়।
—আন্টি ঘরে আছো?
—-কে?
—-আন্টি আমি আয়াজ।
—-ও তুমি, এসো।
আয়াজ ঘরে ঢুকে রিয়ার দিকে কফির মগটা এগিয়ে দেয় আর বলে…
—-বাবা এটা তোমায় দিতে বললো,তাই এলাম।
—-আচ্ছা রেখে যাও,আমি খেয়ে নেবো।
—-ওকে আন্টি।
বলে আয়াজ চলে যায়।রিয়া কফিতে চুমুক দেয় আর বাবা ছেলের কথা ভাবে।ছেলে একদম বাপের জেরক্স কপি,চুপচাপ, চশমা পড়ে।সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে, কে বলবে এই ছেলের মা নেই।হঠাৎ আয়াজের জন্য বুকে এক অজানা মায়া অনুভব করে রিয়া।
.
রাতে খাওয়া-দাওয়া করে রিয়া ও আকাশ নিজেদের ঘরে ঘুমাতে যায়,,ঘুমানোর আগে আকাশ ও আয়াজের ঘর থেকে হাসির আওয়াজ আসছে দেখে কৌতুহলবশত: আকাশের ঘরে উকি দেয়,, দেখে আকাশ আয়াজকে কোলে নিয়ে গল্প করছে ও সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর আয়াজ হেসে গড়িয়ে পড়ছে।বাবা ছেলের এমন হাসি দেখে রিয়ার ঠোটেঁও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
.
এভাবেই চলছিলো তাদের জীবন।আকাশ ও আয়াজ ভুলেও রিয়াকে বিরক্ত করতো না,নিজেদের মত থাকতো,নিজেদের কাজ নিজেরাই করতো,বাবা ও ছেলে কিভাবে এতটা গুছানো স্বভাবের হতে পারে এটা ভেবে রিয়া প্রায় ই অবাক হয়।রাতে মাঝে মাঝে আকাশের ঘরের দরজায় কান পেতে বাবা ছেলের গুটুর গাটুর কথা আর প্রানখোলা হাসি শোনে রিয়া,,,তখন ওরও মন চায় ওদের সাথে যোগ দিতে কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা পায় রিয়া,সেটা ও নিজেও বুঝতে পারে না।
একদিন রাতে রিয়াকে খাবার টেবিলে না দেখে আকাশ আয়াজকে বলে তার নতুন মা কে ডেকে আনতে(কারন তারা নিজেদের রান্না আলাদা করে করলেও খাবার টেবিলে একসাথেই খেতো)।আয়াজ গিয়ে তার নতুন মা কে ডাক দেয় কিন্তু রিয়া উত্তর না দিয়ে বিরবির করে কি যেন বলতে থাকে।আয়াজ সেটা বুঝতে না পেরে রিয়ার হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করে চমকে যায় কারন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে রিয়ার,সাথে সাথে আয়াজ ওর বাবাকে ডাকে,আকাশ ছেলের ডাক শুনে রিয়ার রুমে যায় ও গিয়ে আয়াজকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে?আয়াজ তার বাবাকে বলে নতুন মায়ের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।আকাশ রিয়ার হাত ধরবে কি না দ্বিধায় পড়ে যায় কারন রিয়া তাকে স্বামীর অধিকার দেয় নি,অনেক ভেবে রিয়া অসুস্থ বলে বাধ্য হয়ে ওর হাত ধরে ও ভাবে পড়ে এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে।ওর হাত ধরে দেখে সত্যি মেয়েটার গায়ে অনেক জ্বর।সাথে সাথে আকাশ বালতি দিয়ে পানি নিয়ে এসে রিয়ার মাথায় ঢালতে থাকে ও আয়াজ ভেজা কাপড় দিয়ে রিয়ার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে।প্রায় অনেকক্ষণ এভাবে পানি ঢালা ও জলপট্টি দেয়ার পর রিয়ার জ্বর একটু কমে আসে।আকাশ বারবার আয়াজকে ঘুমাতে যেতে বললেও আয়াজ যায় নি,সে তার নতুন মায়ের এই অবস্থায় তাকে একা রেখে যাবে না বলে গোঁ ধরে রিয়ার পাশেই বসে থাকে,আকাশও আর কিছু বললো না আয়াজকে।
.
এভাবে রাত কেটে যায়,ভোর হলে রিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়,চোখে মেলে দেখে আকাশ চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে ও আয়াজ তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে,,,নিচে পানির বালতি ও ভেজা কাপড় দেখে বুঝতে পারলো কাল তার কি হয়েছিলো।সারারাত বাবা ও ছেলে তার সেবা করেছে এটা ভাবতেই ওর মনটা কেমন যেন করে ওঠলো?যে মানুষটাকে ও স্বামী বলে মানে নি,ছুতেওঁ দেয় না সে মানুষটা সারারাত ধরে তার মাথায় পানি দিয়েছে?তার সেবা করছে?যে নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে রিয়া রেডিমেড বাচ্চা বলে মা বলে ডাকতে দেয় নি,দুরে সরিয়ে রেখেছে সে বাচ্চাটাও তার জন্য রাত জেগেছে?এতটুকু বাচ্চার মনে তার জন্য এতোটা ভালোবাসা দেখে রিয়ার চোখ ভিজে যায়,মনের অজান্তে আয়াজের কপালে ছোট্ট একটা চুমু একেঁ দেয় রিয়া।
এরপর রিয়া আকাশকে ডাক দেয়,ওর ডাক শুনে আকাশ ধড়মড় করে জেগে ওঠে ও চশমা ঠিক করে মাথা নীচু করে জিজ্ঞেস করে…..
—-এখন কেমন বোধ করছেন?
—-জ্বী এখন ভালো।
—-আচ্ছা এখন বিশ্রাম নিন,আমি নাস্তা তৈরি করে আনছি আর ঔষধ এনে দিচ্ছি।
—-জ্বী আচ্ছা।
—-আর শুনুন আজ আপনাকে রান্না করতে হবে না,আমি ই রান্না করবো দুপুরে এসে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসবো।আপনি রেষ্ট নিন।
—-আচ্ছা।
এটা বলে আকাশ আয়াজকে ডেকে তোলে ও নাস্তা রেডি করে রিয়ার ঘরে পাঠিয়ে দেয় ও আয়াজকে স্কুলে না পাঠিয়ে রিয়ার কাছে রেখে যায় যেন কিছু হলে সাথে সাথে আকাশকে জানাতে পারে।সবকিছু ঠিক করে আকাশ অফিসে চলে যায়।
.
আকাশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আয়াজ গুটিগুটি পায়ে গিয়ে রিয়ার ঘরের দরজায় টোকা দেয়…
—-আন্টি ভিতরে আসতে পারি?
—-হ্যঁ এসো।
—-এখন কেমন আছো আন্টি?সরি তুমি করে বলে ফেললাম।
—-না ঠিক আছে তুমি করেই বলো,এখন মোটামুটি সুস্থ।
—-তাহলে এখন নাস্তা করে নাও আন্টি,খেয়ে ঔষধ খেয়ে নাও,আমি পরে আসছি।
—-না না তোমার যেতে হবে না,তুমি বসো সমস্যা নেই।
—-ওকে আন্টি।
—-তুমি নাস্তা করেছো?
—-জ্বী আন্টি বাবার সাথে করেছি।
—-গুড বয়।
—-আচ্ছা আন্টি একটা কথা বলি?
—-হ্যঁ বলো।
—-জানো আন্টি আমি মা কে কখনো দেখিনি,মায়ের আদর কেমন হয় তা আমি জানি না,স্কুলে যখন সব বাচ্চার মা তাদের ছেলে মেয়েকে নিয়ে যায় তখন আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে,মা আজ বেচেঁ থাকলে আমায়ও ঠিক এভাবে স্কুলে নিয়ে যেত।খুব খারাপ লাগে আমার,কিন্তু বাবা কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেয় নি,আমার কাছে বাবা ই আমার মা,কিন্তু তারপরও মায়ের জন্য একটা শূন্যতা ও টান অনুভব করি।আজ মা থাকলে আমিও ওদের মত আদর পেতাম,মা বলে ডাকতে পারতাম কিন্তু সেটা হয়তো আর হবে না আন্টি……..
ছোট্ট বাচ্চার মুখে এসব শুনে রিয়ার মনটা কেদেঁ ওঠে,এতটুকু একটা ছেলে এতকিছু বুঝে,কত গুছিয়ে কথা বলে।ছেলেটা মায়ের জন্য কতটা ব্যকুল তা অনুভব করে রিয়া,এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে সে কিভাবে কষ্ট দিলো এটা ভাবতেই ওর কান্না আসছে,,, কোনমতে নিজেকে সামলে বললো…..
—-মন খারাপ করো না,আমি তো আছি।
—তুমি তো আন্টি,আমার না নও।
—-আন্টি তাতে কি, আমায় মায়ের মত ভালোবাসতে পারবে না?
—হুম আন্টি পারবো।
—এই তো গুড বয়।
বলে আয়াজকে কাছে টেনে নেয় ও নিজের হাতে নাস্তা খাইয়ে দেয়,খাওয়ানোর সময় দেখে আয়াজের চোখ থেকে পানি পড়ছে,তা দেখে রিয়া বলে…..
—-কি আয়াজ কাঁদছো কেনো?
—-আন্টি আমায় কখনো এভাবে কেউ খাইয়ে দেয় নি,আদর করে কাছে টেনে নেয় নি,তুমি এমন করে খাওয়াচ্ছো আর আদর করছো তাই মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো,মা থাকলে আমায় ঠিক এভাবেই আদর করে খাইয়ে দিত আর আদর করতো,,বলে চোখের পানি মোছে আয়াজ।
আয়াজের কথা রিয়ার মনটা মমতায় ভরে যায়,এইটুকু বাচ্চা ছেলে কিভাবে মা ছাড়া বড় হলো,কিভাবে থাকে মা কে ছাড়া…ওর মনে তখন মমতা জাগ্রত হয় আয়াজের জন্য,আয়াজকে কাছে টেনে আদর করে তার কপালে চুমু দেয় আর বলে আমি তো আছি,কান্না করো না।
.
আকাশ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকালেই চলে আসে,এসে ফ্রেশ হয়ে রান্না বসায়।রান্না শেষ হলে আয়াজকে দিয়ে রিয়াকে খেতে ডাক দেয় আকাশ,রিয়া এলে আকাশ তার শারীরিক অবস্থা জিজ্ঞেস করে আর এখন কেমন বোধ করছে সেটা জানতে চায়।রিয়া বলে সে এখন সুস্থ আছে আর ভালো বোধ করছে।
খাওয়া শেষ হলে রিয়া ঔষধ খেয়ে বিশ্রাম নেয় ও কিছুক্ষণ ঘুমায়,সন্ধ্যায় ওর ঘুম ভাঙ্গে।রিয়ার ঘুম ভাঙলে আজও আয়াজ এসে তাকে কফি দিয়ে যায় ও এখন কেমন আছে সেটা জানতে চায়,রিয়া বলল সে এখন পুরোপুরি সুস্থ।
রাতে খাওয়ার পর যথারীতি আকাশ ও আয়াজ তাদের রুমে চলে যায়,কিছুক্ষণ পর রিয়া চুপিচুপি তাদের রুমে যায় ও দরজায় কান পেতে ওদের কথোপকথন শোনে।কথাগুলি শুনে আকাশ ও আয়াজের জন্য ওর মায়া হয়,নিজের ঘরে এসে অনেক কিছু চিন্তা ভাবনা করে রিয়া ,,,,আকাশকে স্বামীত্ব ফলাতে না বলায় আকাশও ওকে জোড় করে নি,বিরক্ত করে নি,যা যা বলেছে সেটাই করেছে, ছোট্ট বাচ্চাটাও ওর কথা শুনেছে।
সবকিছু আলাদা করেছে,নিজেদের গুছিয়ে রেখেছে,ওর সেবাও করেছে।ওদের এই ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ রিয়ার মনকে নরম করে দেয়,মনে মায়া ও মমতার জন্ম দেয়,রিয়া ঠিক করে সে যতদিন এখানে আছে ততদিন ঘরের সব কাজ ও নিজে করবে,আয়াজকে নিজে স্কুলে দিয়ে আসবে,রান্না ও নিজে করবে।
.
এসব ভেবেও কেন জানি এগুলো করতে পারছিলো না রিয়া,,,এরপরের বেশ কয়েকদিনও একই ঘটনার
পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলো।রিয়ার কথামত
আকাশ আর আয়াজ দুজনের কেউই ওকে কোনরকম
বিরক্ত করতো না, দুজনের এই নির্লিপ্ততা
রিয়াকে প্রথমে স্বস্তি এনে দিলেও আজ সেটা
ওর রাগের কারন হয়ে ওঠলো,,সারাদিন নিজের জন্য রান্না করা বাদে দুহাত
গুটিয়ে অথর্বর মত বসে থাকা ছাড়া ওর
কোন কাজ নেই। ওর মেজাজ বেশি
বিগড়াতো তখন, যখন বাপ আর ছেলের গুটুর
গুটুর গল্প আর পেট ফাটানো হাসির শব্দ শুনে রিয়া কৌতুহলী হয়ে সামনে দাড়াতেই
দুজনই চুপ মেরে যেত। এমন ভাব ধরত যেন পেটে
বোমা মারলেও মুখ দিয়ে কিছু বেরুবে
না। কিন্তু রিয়া আড়াল হওয়ামাত্র আবারও
হা হা হি হি হো হো শুরু হতো।
.
এসব দেখে রাগে পরেরদিন সকালে নাস্তার টেবিলের সামনে দাড়িয়ে রিয়া রাগী গলায় ঘোষনা
করলো,,,,,,
‘‘আমি যতদিন এ বাড়িতে আছি
কাল থেকে ততদিন পর্যন্ত সকালের
নাস্তা থেকে শুরু করে ঘর গোছানো, রান্না করা,কাপড় ধোয়া আমি
করবো,,, আয়াজকে স্কুল থেকে নিয়ে আসবো,,,
আমি টিভি দেখি আর নাই দেখি টিভির
রিমোট আমার হাতে থাকবে আর তোমাদের
দুজনের যত গাটুর গুটুর আলাপ আছে তা শুনি
আর নাই শুনি আমার সামনেই হতে হবে।
আর আয়াজ আজ থেকে তুমি আমার সাথে
ঘুমুবে।’’
একথা শোনার আধ ঘণ্টার মাঝেই আয়াজ পার্টি বদল করে বাবার ঘর থেকে ওর
ব্যাগ পোটলা গুছিয়ে লাফাতে লাফাতে
রিয়ার ঘরে চলে গেলো।
.
তিনমাস পূর্তির দিনগুলো এরপর যেন দ্রুতই
কাটতে লাগলো। বাবা ছেলের
নির্লিপ্ততা ও বোবা অভিনয়ের আড়ালে
জমিয়ে রাখা ভালবাসাগুলো রিয়াও টের
পাচ্ছিলো অনেক দ্রুততায়। এই দুটো
মানুষের যত গল্প হাসি চিন্তা স্বপ্ন সবই যে রিয়াকে
ঘিরে তা জানার জন্য মাঝে মাঝেই
দরজায় কান পেতে থাকতে হতো,আয়াজ
আকাশের সাথে কথা বলার সময় রিয়াকে যে
গভীর
মমতা ও মায়া নিয়ে মা বলে ডাকে তা শুনে রিয়ার মনেও মমতা জাগ্রত হয়,দিনে একবার শাড়ির আচলঁ কোমড়ে পেচিয়েঁ আকাশের সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া না করলে
রিয়ার দিন টা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। টিভিতে
খেলা দেখার সময় সবসময়ের বাবার
পক্ষের দলকে সাপোর্ট করা আয়াজ যখন
নানান অজুহাতে রিয়ার পক্ষে বাবার সাথে তর্ক করে রিয়া
তখন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আয়াজকে।
এইটুকুন বাচ্চা রোজ রাতে যখন ঘুমের ভান
করে অপেক্ষায় থাকে রিয়া ঘুমিয়ে পড়ার
পর তার গায়ে আলতো করে হাত রাখবে,
এটা দেখে রিয়ার চোখে তখন ভালবাসার মেঘেরা
ভীড় করে।
প্রতিদিন আয়াজকে স্কুল থেকে আনতে
গিয়ে অপেক্ষায় থাকা রিয়া যখন সকলের মুখে
আয়াজের বলা কথা ‘‘আমার মা ই পৃথিবীর সেরা
মা’’ শুনে আক্ষেপ করে নিজের উপর। এই
ছোট্ট বাচ্চার হৃদয়ে রিয়ার জন্য এত ভালবাসা কিভাবে
ও সাথে নিয়ে চলে যাবে তাই
ভেবে ওর মনটা হাহাকার করে ওঠে,কান্নায় বুকটা ফেটে যায়।
.
অবশেষে তিনজন মানুষের আবেগের
অভিনয় করার দিন ফুরিয়ে আসলো।
আকাশ পরদিনের বাসের টিকিট কেটে এনে
রিয়ার হাতে দিল। সেদিন বর্ষার দিন ছিল।
সারারাত মুষলধারে বৃষ্টি হলো,,,, প্রবল বর্ষনের
সাথে আয়াজ আর আকাশের চোখের জলও মিলে
মিশে একাকার হল সে রাতে।
.
চলে যাওয়ার মুহূর্তটা যতটা অস্বস্তিকর
হবে বলে রিয়া ভেবেছিল তেমন কিছুই হল
না। শুধু বাসে উঠতে গিয়ে টান লাগায় চমকে ফিরে
তাকিয়ে দেখল আয়াজ ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ ছলছল করে এক
হাতে ওর শাড়ির আঁচল খামচি দিয়ে ধরে
আছে। আকাশ মৃদু হেসে বলল, ‘‘আন্টির
দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা,,ওর কথায়
হাতের মুঠি থেকে শাড়ির আঁচলের
কোনাটা ছেড়ে দিল আয়াজ। বাসে ওঠে রিয়ার বাসটা চোখের আড়াল হতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলো আয়াজ,আজ যে তার মা আবারো তাকে ছেড়ে চলে গেলো,,, আকাশও ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো কেননা সেও এতদিনে রিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিলো,,কিন্তু সেও আজ সামিয়ার মত একা করে চলে গেলো মায়া লাগিয়ে দিয়ে..অঝোরে কাঁদছে বাবা আর ছেলে।
.
রিয়াকে বাসে
তুলে দিয়ে কিছুক্ষণ কেদেঁ চোখের পানি মুছে আকাশ আয়াজকে নিয়ে পার্কে
গেলো,ভালো আইসক্রিম খাওয়ালো,নানা জায়গায় ঘুরলো,,, আজ অফিস ছুটি নিয়েছে আকাশ ,,,আয়াজকে
সাথে নিয়ে সারাদিন ঘুরবে বলে ,,এতে তার মনটা একটু হলেও ভালো থাকবে হয়তো।
.
সারাদিন বাইরে ঘুরে বিকেলে বাসায় ফিরতেই আকাশ ও আয়াজের চোখ
কপালে উঠলো,,ফ্ল্যাটের দরজার সামনের সিঁড়িতে
ব্যগ রেখে রিয়া বসে আছে,,ওদের দেখে চোখ মুছতে
মুছতে উঠে দাঁড়ালো ও,,শাড়ির আচলঁ কোমড়ে পেচিয়েঁ ধমকের সুরে বলল,
‘‘বাড়ি থেকে আপদ বিদায় করে দিয়েই বাপ বেটা
মিলে
সারাদিন মজা করে বেরুলে তাই
না? আকাশের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,, এই যে গাধা ফোন বন্ধ কেন তোমার”? কতশতবার নাম্বার
ডায়াল করেছি?’’সেটা কি দেখেছো একবারো???
হতভম্ব আকাশ পকেট থেকে মোবাইল বের
করে দেখলো সেটা বন্ধ হয়ে আছে।
আকাশ কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘‘কিভাবে যেন বন্ধ
হয়ে গেছে বুঝতে পারি নি,মনে হয় চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিলো,,কি ব্যাপার তুমি ফিরে
এলে কেনো?? কিছু কি ফেলে গিয়েছো?’’
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘‘গাধা
কোথাকার,,,আমি কি বলেছিলাম
আমাকে টিকিট কেটে এনে দাও? কেনো যাওয়ার
সময়
আটকালে না আমাকে? তোমার কি অধিকার ছিলো না??একবার থেকে
যেতে বললে কি আমি খেয়ে ফেলতাম
তোমাদের?’’
এটা শুনেই ছোট্ট আয়াজ কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে রিয়াকে জড়িয়ে
ধরে বলল, ‘‘মা আমাকে রেখে আর কখনো যাবে
না তো?’’
রিয়াও ওকে আরও শক্ত করে ধরে বলল, ‘‘আমার
বাবাটাকে ছেড়ে আমি আর কখখনও
কোথথাও যাবো না,কোনদিনও যাবো না ,,, তোমার মা তোমায় একা রেখে কোথথাও যাবে না,,, অনেক হয়েছে, আর
কাঁদবে না বাবা।’’
রিয়ার কথাগুলি শুনে আকাশ চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাওয়া
চশমাটা খুলে মুছতে শুরু করলো।এটা দেখে রিয়া ধমক দিয়ে বলল,
‘‘এই যে গাধা, খালি হাতে ভেজা
চশমা মুছলে হবে? এদিকে আসো।’’আকাশ
এগিয়ে যেতেই ওর হাত থেকে চশমা
নিয়ে রিয়া ওর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতে
মুছতে বলল, ‘‘আমার বাস ছেড়ে যাওয়ার
সাথে সাথে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অমন
বাচ্চাদের মত ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলে
কেনো? ছেলের কান্না দেখে? নাকি এই
হিটলারনীর জন্য? বাসের
জানালা দিয়ে মাথা বের করে এই দৃশ্য
দেখে কি কোন মেয়ের চলে যাওয়ার
ক্ষমতা থাকে?’’
‘‘এতই যখন সব বুঝতে তাহলে চলে যাচ্ছিলে কেনো?’’
‘‘তুমি যেতে দিলে কেনো গাধা,আটকাতে পারলা না?’’
আয়াজও এক হাতে ওর মাকে ধরে অন্য হাতে চশমা
খুলে রিয়াকে বলল, ‘‘মা আমারটাও মুছে
দাও।’’
ওর কথা শুনে আকাশ আর রিয়া হেসে
ফেললো।এদের ছেড়ে আর কখনো কোথাও যাবে না বলে স্থির করে রিয়া,,,কোথায় যাবে সে?? কারন এটা যে তার মায়ার সংসার…………..
সুখে থাকুক আকাশ,রিয়া ও আয়াজের মায়ার সংসার,কানায় কানায় ভালোবাসা দিয়ে ভরে থাকুক ওদের জীবন………
লিখাঃঅভিমানী নিশাদ

0 Comments