এখানে আমার নাম ব্যবহার করা হয়নি এবং আমার ছাত্রছাত্রী সবার নাম প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রুপা, রবি, রনি ।

ভালোবাসার গল্প

তখন আমি আনেক ছোট । বয়স সাত কিংবা আট। অন্য সবার থেকে একটু আলাদা টাইফের ছেলে ছিলাম আমি। সাহসী না ভিতু ছিলাম । তাই যদিও সবার সাথে মিলে মিশে থাকতাম তথাপি মারামারি লাগলে সবার আগে ছুটে পালাতাম। নিন্ম পরিবারের ছেলে তাই মনে ভয় কাজ করত । বাবা মজুরি দিয়ে সংসার চালাতেন। খেলা ধূলা ভাল পারতাম । তাই পড়ালেখা থেকে খেলাধুলার প্রতি বেশি মনোযোগ ছিল। এলাকার সবার সাথে যখন থাকতাম তো সবাই হৈ চৈ করে বেড়াতাম। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )

এলাকার মানুষের নিজের নাম ছাড়াও দুষ্টু লোকদের দেওয়া নাম আছে। তো আমি একদিন সবার সাথে রাস্তার পাশে বসে আছি। আমাদের বাড়ির পাশে আবার বড় রাস্তা আছে। রাস্তার পাশে চাষের জমি। খোলা মাঠ হওয়ার কারণে রাস্তার পাশে বসলে ঠাণ্ডা বাতাস লাগত। এখনো আমরা সেখানে বসি।
এমন একটি চঞ্চল মেয়ে ছিল আমাদের পাশের বাড়ির। যাকে সবাই গুন বলে ডাকত। আসলেও সে ছিল একটু বেশি চঞ্চল। সে মেয়েটি তার বাড়ির এক জেঠুর সাথে দোকান থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমাদের মাঝে একজন গুন বলে উঠল। মেয়েটি অনেক বকাবকি করল। সেই প্রথম আমি মেয়েটিকে দেখি। পরে সবার কাছে জানতে পারি তার নাম রুপা । তখন থেকেই কিন্তু মেয়েটির প্রতি আমি একটু দুর্বল ছিলাম।
এর মধ্যে আমি ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হলাম । পরিবারের অভাবের কারণে তিন মাস পরে আমি ঢাকায় চলে যাই। এক বছর থাকার পর বাড়িতে আসি। আমি ঢাকা থাকার সময় প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখতাম আমি পড়াশুনা করি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাকে খুব আদর করে। ঘুম থেকে উঠে চোখের পানি মুচতাম। বাড়িতে আসার পর আমার ইচ্ছা হয় আবার পড়ার জন্য। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )
আমি ঘরে আমার পড়ার কথা বলি । সবাই খুশি হয় এবং আমাকে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেয়।
আমি প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় তিন বিষয় ফেল করি। আমার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ দেখে সবাই আমাকে উৎসাহ দিতে থাকে। আমিও আরো বেশি করে চেষ্টা করতে থাকি। অষ্টম শ্রেণীতে আমার রোল ১ । বাড়ির পাশের এক চাচা তার ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য বলে। আমিও রাজি হয়ে যাই। তিনি বিদেশ থাকেন। একটি মাত্র ছেলে নাম রনি । তাই কিন্ডার গার্ডেনে প্লে শ্রেণীতে ভর্তি করেন। তখন থেকে আমার প্রাইভেট জীবন শুরু।
এক বছর পড়ানোর পর সে পরীক্ষায় মোটিমুটি ভালো করে। রনি নানার বাড়ি আবার রুপা বাড়ি । রনির আম্মু আবার আমাকে নিজের ছেলের মত জানে। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। রনির সাথে আবার রুপার ছোট ভাই পড়ত। কথায় কথায় রুপার আম্মু রনির আম্মুকে জিজ্ঞেস করল রনি কার কাছে প্রাইভেট পড়ে। তখন তিনি আমার কথা বললেন। রুপার আম্মু রনির আম্মুকে বললেন আমি যেন তার সাথে দেখা করি।
আমি যখন শুনলাম তখন আমি খুব আনন্দিত হলাম। একদিন তাদের বাড়িতে গেলাম। যাকে পড়াবো তার নাম পিয়াস। পিয়াস খুব দুষ্ট ছেলে। কথা হলো নাজিমের সাথে পড়বে। দুজনকে পড়াচ্ছি প্রায় এক বছর । আমি এ বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে রনি ও রবি এর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু। রবি বাড়িতে পড়েনা তাই তাকে পরীক্ষার সময় তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতে হবে। এর ভিতর আমি আরো তিনটা প্রাইভেট পড়াই। মোটামুটি আমার ভালো সুনাম ছড়িয়ে পড়ল এলাকায়। রবি কে যখন পড়াতে গেলাম দু দিনের দিন রুপা আমার সামনে নাস্তা নিয়ে আসল। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )
আন্টি আমার পাশে খাটে বসে আছেন। বললেন এই আমার বড় মেয়ে। অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে। তখন আমি রুপাকে অনেক গুলো প্রশ্ন করলাম । সে উত্তর দিতে পারেনি। আমি তাকে ইংরেজির উপর প্রশ্ন করেছিলাম। তখন তাকে বললাম তোমার থেকে বড় ছাত্র-ছত্রী পড়াচ্ছি। আমি আবার আমার এক ক্লাসমেটস কে হিসাব বিজ্ঞান ও ইংরেজি পড়াতাম। তাই আমার সাহস ও ভালো ছিল। এছাড়াও আমি দশম শ্রেনীতে থাকা অবস্থায় সকাল ছয়টায় এক বাড়িতে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াতাম , তখন আমার এক শিক্ষকও সেখানে একই সময়ে প্রাইভেট পড়াতো। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। এসব কারনেই পড়ালেখার ব্যাপারে অনেক সাহস ছিল। ( Valobasar golpo ভালোবাসার গল্প )
কথায় কথায় রুপা ও রবিকে তাদের বাড়িতে পড়ানোর জন্য প্রস্তাব আসলো। প্রথম প্রথম রুপা একটু কম পারতো। পরে বুঝতে পারলাম সে ভালোভাবে বাংলাও পড়তে পারেনা । আমি তাকে বাংলা জাতীয় সব বিষয় পড়ানো শুরু করলাম। এভাবে পড়াতে পড়াতে তার আর আমার মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়। পড়ালেখায় ও তারা অনেক ভালো করা শুরু করল। এর মধ্যে আমি এস এস সি পরীক্ষা দিলাম।
এখন আমি যেদিন সময় মত পড়াতে না যাই তবে সে পাগলের মত হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নয় আন্তরিকতার সম্পর্ক। সে যখন দশম শ্রেণীতে উঠল, যত সমস্যা তখন থেকে শুরু হলো । তার শ্রেণীর ক্লাসমেটস ও শিক্ষকরা পর্যন্ত তার পেছনে লাগল। সবাই তাকে কান পোঁড়া দিতে লাগল যে তোকে এতো ভালোভাবে প্রাইভেট পড়ায় তার কোন বাজে মতলব আছে। তার বাড়ির ছেলে-মেয়ে, বাড়ির বড় ভাইয়ের বউয়েরা তাকে খুব হেনস্থা করত আমার ব্যাপার নিয়ে। এসব নিয়ে সে সবার সাথে খুব ঝগড়া করত।
আমি তাকে প্রাইভেট পড়ানোর শুরু থেকে ভুলে গিয়েছিলাম আমি তাকে কখনো দেখেছি। প্রায় দু বছর আমি তাদেরকে পড়াই। রুপা যখন টেস্ট পরীক্ষা দিল , তারপর সে একদিন আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল আমি তাকে ভালোবাসি কিনা? আমি তো আবাক! আমি তখন তাকে সত্যি কথা বললাম।আরও প্রায় আট বছর আগে আমি যে দিন তাকে প্রথম দেখি সেদিন থেকে তাকে খুব ভালো লাগতো। তবে এখন সেসব নিয়ে ভাবিনা কারন আমার কাছে আমার ক্যারিয়ার বড়। সে এসব শুনে সেদিন আর কিছু বলল না ।
পরের দিন প্রাইভেটে যাওয়ার পর সে আমাকে বলল আমি আপনাকে ভালোবাসি এখন আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম। আমার তিন দিন খাওয়া ঘুম নেই। তিন দিন আমি প্রাইভেটে যাইনি। এ তিনদিন সে কেঁদে কেঁদে কাটাল। পরে আমি প্রাইভেটে গেলাম। সে দিন প্রথম সে পুরোটা সময় আমার হাত ধরে পড়া শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আমি আর তাকে ফেরাতে পারলাম না। শুরু হল আমাদের নতুন একটা সম্পর্ক। শুরু হল আমার জীবনে একটা নতুন অধ্যায়। বইতে থাকল আমার জীবনের বসন্ত। মনের অজান্তেও গান গাইতাম।
তার মাঝেও নতুন ছন্দ। তার চঞ্চলতা নেই , সে খুব আনন্দে দিন কাটায়। খুব আনন্দে যেতে লাগল দিন গুলি। সে কোথাও গেলে আমার জন্য একটা উপহার নিয়ে আসত। একবার সে আমাকে একটা তাজ মহল গিফট দিয়েছে। আমার কাছে একটা এক পয়সা ছিল। যা আমার কাছে এখনও আছে। আমি তাকে এক পয়সা উপহার দিলাম। সে আঙ্ক যত্নে সেটি নিজের কাছে রাখল।
এর মধ্যে আমাদের কথা বার্তা , আচার আচরণ তার বাড়ির এক চাচার নজরে আসে। এমনিতেও তাদের সাথে ঐ চাচার সাথে ছিল দা কুমড়া সম্পর্ক। কবে থেকে সে এবং তার আমাদের পাহারা দেওয়া শুরু করেছে আমরা কেউ তা টের পাইনি। আমি তখন রুপাকে রাত আটটার পর পড়াতাম । একদিন রুপা আমার পেছনে এসে দাড়াল এবং আমার মাথার ছুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছে। এর মাঝে সে আমাকে একবার আদর করে একটা চুমু দিয়েছে । কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সামনের জানালার শব্দ হল। সে তো একেবারে অসহায় হয়ে গেল। আমি কি বলব কিছু বুঝতে পারছি না। দু জনে একসাথে বাহিরে চারিদিকে খুজলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলামনা। এরপর আমি বাড়ি চলে আসলাম।
পরের দিন তো আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, যখন বাহিরে গিয়ে শুনি, সে এবং তার বউ মিলে কি সব বাজে কথা আমাদের দুজনের নামে রটালো। রুপা এবং তার আম্মু দুজনে কান্না কাটি করে দিন কাটিয়েছে। যথা সময়ে আমি প্রাইভেটে গেলাম। পড়ার শেষে রুপার আম্মু আমাকে বলল বাবা তুমি কাল থেকে বিকেল বেলা পড়াতে আসবা। আমিও বিকেলে পড়ানো শুরু করলাম।
তারপর থেকে রুপা আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করল। সে আমাকে উল্টাপাল্টা সব প্রশ্ন করা শুরু করল। যেমন আমি কি আপনাকে কথা দিয়েছি?, আমাকে আপনি ভুলে যান, আপনি গরিব , আপনার টাকা পয়সা নাই, আমি কোন গরিব ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না, তার কাছে আমার এখন আর কোনো মূল্য নেই। এবং সে আমাকে ধমকও দিল যে আমার বাবার টাকা আছে আপনি যদি আমাকে ভুলে না যান তা হলে টাকা দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিচার বসানো হবে।
আসলেও তাই আমি তো প্রাইভেট পড়ানো টাকা দিয়ে নিজে পড়ালেখা করি ও পরিবারের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি। এর মাঝে আমি এইচ এস সি পরীক্ষা দিলাম। আমি কোন কূল কিনারা না পেয়ে তাকে প্রাইভেট পড়ানো বাদ দিলাম। কিন্তু রবি রনির সাথে এসে পড়ে। এখন আমি প্রতি রাতে রুপার দেওয়া উপহার গুলো নিয়ে দেখি এবং চোখের জল ফেলি। একদিন আমি আমার এক পয়সার কথা চিন্তা করলাম। অনেক ভাবনা চিন্তার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার এক পয়সা আমার কাছে রাখব। রবি তখনো আমার কথা শুনত।
একদিন আমি রবিকে বললাম তোকে একটা কাজ দেব, যদি করতে পারিস তবে তোর পুরষ্কার আছে। সে রাজি হল। এবং অনেক কষ্ট করে সে আমার এক পয়সা আমার কাছে এনে দিল। তখন আমি যেন আমার ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেলাম। তাকে পুরষ্কার দিলাম। এক বছর পর শুনলাম তার বিয়ে হয়েছে , সে প্রেম করে বিয়ে করেছে । আমি আজও একা । আমার এক পয়সা নিয়ে আমি এখন পুরনো স্মৃতি মনে করি। আমি এখন বুঝতে পেরেছি আমি কত বোকা ছিলাম। যদি বোকা না হতাম তবে আমার ভালবাসা বৃথা যেত না।
শেয়ার করুন